শেয়ারবাজারে নতুন? গল্পে গল্পে শিখুন ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস, ক্যান্ডেলস্টিক ও সিগন্যাল
নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য গল্পের ভাষায় শেয়ারবাজারের ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস, ক্যান্ডেলস্টিক প্যাটার্ন, ইন্ডিকেটর ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা।

এই লেখাটি কার জন্য? যিনি কখনো শেয়ার কেনেননি, অথবা কিনেছেন কিন্তু চার্ট দেখলে মাথা ঘুরে যায়। কোনো আগাম জ্ঞান লাগবে না। আমরা একটা গল্প ধরে এগোব, সহজ জায়গা থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে কঠিন বিষয়ে যাব। শেষে একটা শব্দকোষ থাকছে, যাতে কোনো টার্ম আপনার হাতছাড়া না হয়।
সতর্কতা: এটি শিক্ষামূলক লেখা। কোনো শেয়ার কিনতে বা বেচতে বলা হচ্ছে না, এটি বিনিয়োগ-পরামর্শও নয়। গল্পের চরিত্র, কোম্পানি ও সংখ্যাগুলো কাল্পনিক। শেয়ারবাজারে মূলধন হারানোর ঝুঁকি আছে। টাকা ঢালার আগে নিজে বুঝে নিন, প্রয়োজনে লাইসেন্সপ্রাপ্ত পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলুন।
শুরুর গল্প: তানভীরের প্রথম বোনাস
তানভীর ঢাকার একটি সফটওয়্যার কোম্পানিতে কাজ করে। এ বছর ঈদ-বোনাস আর জমানো টাকা মিলিয়ে তার হাতে এসেছে পাঁচ লাখ টাকা। ব্যাংকে রাখলে সুদ আসে, কিন্তু মূল্যস্ফীতির (ইনফ্লেশন) কারণে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অফিসের এক সহকর্মী সেদিন বলল, "শেয়ারবাজারে গেলে টাকা দ্বিগুণ হয়।" আরেকজন বলল, "ঢুকলেই সব হারাবে।"
দুই কথার কোনোটাই পুরো সত্য নয়। তানভীর তাই ঠিক করল, আগে শিখবে, তারপর টাকা ঢালবে। তার বাবার পুরোনো বন্ধু মিজান চাচা পনেরো বছর ধরে শেয়ারবাজারে আছেন। এক শুক্রবার বিকেলে চায়ের কাপ হাতে তানভীর তাঁর কাছে গিয়ে বসল।
"চাচা, আমি কোথা থেকে শুরু করব?"
মিজান চাচা হেসে বললেন, "একদম গোড়া থেকে। আগে বলো তো, শেয়ার জিনিসটা কী?"
অধ্যায় ১: শেয়ারবাজারের একদম গোড়ার কথা
শেয়ার কী?
মনে করো, তিন বন্ধু মিলে একটা কাপড়ের কারখানা দিতে চায়, কিন্তু টাকা লাগবে এক হাজার টাকার। তারা পুরো কারখানাকে ১০০টি সমান টুকরোয় ভাগ করল, প্রতিটির দাম ১০ টাকা। এই এক একটা টুকরোই শেয়ার (Share/Stock)। যার কাছে যত টুকরো, কারখানার তত অংশের মালিক সে। কারখানা লাভ করলে সেই লাভের ভাগ পাবে, আবার ক্ষতি হলে তাও ভাগ করে নিতে হবে।
কারখানা বড় হয়ে জনগণের কাছ থেকে টাকা তুলতে চাইলে সে নিজের শেয়ার জনগণের কাছে বিক্রি করে। এই প্রথমবার জনগণের কাছে শেয়ার ছাড়াকে বলে আইপিও (IPO, Initial Public Offering)। আইপিওর পরে কোম্পানি তালিকাভুক্ত (Listed) হয়, মানে তার শেয়ার এক্সচেঞ্জে কেনাবেচা করা যায়।
শেয়ারবাজার ও এক্সচেঞ্জ
যে জায়গায় এই কেনাবেচা হয় সেটাই শেয়ারবাজার বা স্টক এক্সচেঞ্জ। আমাদের দেশে দুটি: ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই, DSE) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই, CSE)। এদের আইন-কানুন দেখে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি, BSEC)।
তুমি নিজে সরাসরি এক্সচেঞ্জে গিয়ে শেয়ার কিনতে পারবে না। এজন্য লাগে:
- ব্রোকারেজ হাউস: লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, যারা তোমার হয়ে কেনাবেচা করে। প্রতিটি কেনাবেচায় তারা কমিশন নেয়।
- বিও অ্যাকাউন্ট (BO Account, Beneficiary Owner's Account): তোমার শেয়ার রাখার ডিজিটাল ব্যাংক-খাতা। শেয়ার কাগজে নয়, ইলেকট্রনিক ফরম্যাটে থাকে।
- সিডিবিএল (CDBL): শেয়ারের ডিজিটাল ডিপোজিটরি, মানে শেয়ারের মালিকানার সরকারি খাতা।
কে কার সঙ্গে কীভাবে জড়িত?
তানভীর বলল, "চাচা, এতগুলো নাম শুনলাম: বিএসইসি, ডিএসই, সিডিবিএল, ব্রোকার। এরা সবাই কী একসঙ্গে কাজ করে?"
মিজান চাচা একটা কাগজ টেনে নিয়ে আঁকতে বসলেন। "একটা ক্রিকেট ম্যাচের কথা ভাবো। মাঠ আছে, আম্পায়ার আছে, স্কোরবোর্ড আছে, আর খেলোয়াড়দের হয়ে যারা মাঠে নামে তারা আছে। শেয়ারবাজারও ঠিক তাই।"
| প্রতিষ্ঠান | ক্রিকেটের উপমা | আসল কাজ |
|---|---|---|
| BSEC | আম্পায়ার ও ক্রিকেট বোর্ড | পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইনের অধীনে নিয়ম বানায়, এক্সচেঞ্জ, ব্রোকার, ডিপোজিটরি ও অন্য প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়, নতুন কোম্পানির আইপিও অনুমোদন করে, আর অনিয়ম হলে ব্যবস্থা নেয় |
| DSE / CSE | খেলার মাঠ | এখানে ক্রেতা-বিক্রেতার অর্ডার মিলে লেনদেন হয়। এক্সচেঞ্জ কোম্পানিকে তালিকাভুক্ত করে, ট্রেডিং সিস্টেম চালায়, লেনদেনের ওপর নজর রাখে (সার্ভেইল্যান্স), আর ব্রোকারদের সদস্যপদ দেয় |
| ব্রোকারেজ হাউস | মাঠে নামা খেলোয়াড়ের প্রতিনিধি | এক্সচেঞ্জের সদস্য (TREC ধারক)। সাধারণ মানুষ সরাসরি মাঠে নামতে পারে না, তাই ব্রোকার তার হয়ে অর্ডার দেয়। সাধারণত ডিপোজিটরি পার্টিসিপ্যান্ট (DP) হিসেবেও কাজ করে, অর্থাৎ বিও অ্যাকাউন্ট খুলে দেয় |
| CDBL | স্কোরবোর্ড ও মালিকানার খাতা | শেয়ারের ইলেকট্রনিক ভান্ডার। কার নামে কত শেয়ার, তা বিও অ্যাকাউন্টে লেখা থাকে। কেনাবেচার পর এক অ্যাকাউন্ট থেকে আরেক অ্যাকাউন্টে শেয়ার সরায়। মূলত ডিএসই ও সিএসইর মালিকানাধীন, আর নিজেও বিএসইসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত |
| ব্যাংক | টাকার কোষাগার | বিনিয়োগকারী ও ব্রোকারের টাকা জমা, উত্তোলন ও সেটেলমেন্টের পথ |
| বিনিয়োগকারী | দর্শক থেকে মালিক | বিও ও ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খুলে ব্রোকারের মাধ্যমে কেনাবেচা করে |
| তালিকাভুক্ত কোম্পানি | যাদের নিয়ে খেলা | শেয়ার ছেড়ে মূলধন তোলে, বিনিময়ে নিয়মিত তথ্য প্রকাশ করতে বাধ্য |
একটি শেয়ার কেনার পুরো যাত্রা
ধরো, তানভীর ১০০টি শেয়ার কিনতে চায়। ছবির সংখ্যা ধরে ধরে:
- শুরুর প্রস্তুতি (একবারই): তানভীর একটি ব্রোকারেজ হাউসে গিয়ে (বা অনলাইনে) বিও অ্যাকাউন্ট আর ট্রেডিং অ্যাকাউন্ট খোলে। বিও অ্যাকাউন্টটি ব্রোকার (DP) খুলে দিলেও আসল রেকর্ড থাকে CDBL-এ।
- ধাপ ১: তানভীর ব্রোকারকে জানায়, "এই কোম্পানির ১০০ শেয়ার এই দামে কিনব।" সঙ্গে টাকা জমা রাখে, যা ব্যাংকের মাধ্যমে ব্রোকারের কাছে পৌঁছায়।
- ধাপ ২: ব্রোকার অর্ডারটি ডিএসইর ট্রেডিং সিস্টেমে পাঠায়। সিস্টেম একই দামের কোনো বিক্রেতা পেলে অর্ডার মিলিয়ে দেয়, আর ট্রেড নিশ্চিত হয়। ব্রোকার তানভীরকে তা জানায়।
- ধাপ ৩: ডিএসই ট্রেডের তথ্য পাঠায় CDBL-এ। এখান থেকে শুরু হয় ক্লিয়ারিং ও সেটেলমেন্ট, যা সাধারণত দুই কর্মদিবসে (T+2) শেষ হয়।
- ধাপ ৪: CDBL বিক্রেতার বিও অ্যাকাউন্ট থেকে ১০০ শেয়ার কেটে তানভীরের বিও অ্যাকাউন্টে জমা করে। এখন শেয়ারগুলো আইনত তানভীরের।
- ধাপ ৫: একই সময়ে টাকার দিকটা মিটে যায়। তানভীরের দেওয়া টাকা ব্যাংকের মাধ্যমে বিক্রেতার পক্ষে পৌঁছে যায়। ব্রোকার নিজের কমিশন কেটে রাখে।
এই পুরো সময় BSEC চুপচাপ ওপর থেকে দেখে। কোথাও কারসাজি বা অনিয়ম হলে তদন্ত করে শাস্তি দেয়। এক্সচেঞ্জ ও ব্রোকারের কাছে যে রিপোর্ট আসে, সেগুলোও কমিশনের কাছে পৌঁছায়।
এক লাইনে মনে রাখার সূত্র: BSEC নিয়ম বানায়, DSE বাজার চালায়, ব্রোকার তোমার হয়ে কেনাবেচা করে, আর CDBL তোমার শেয়ারের মালিকানা লিখে রাখে।
সরলীকৃত চিত্র: এখানে মূল সম্পর্কগুলো সহজ করে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে আরও প্রতিষ্ঠান জড়িত, যেমন মার্চেন্ট ব্যাংক, কাস্টডিয়ান, ক্রেডিট রেটিং সংস্থা, নিরীক্ষক ও সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়। ক্লিয়ারিং-সেটেলমেন্টের খুঁটিনাটি নিয়মও সময়ে সময়ে বদলায়।
দাম ওঠানামা করে কেন?
শেয়ারের দাম ঠিক হয় চাহিদা আর জোগানে। বেশি মানুষ কিনতে চাইলে দাম বাড়ে, বেশি মানুষ বেচতে চাইলে দাম কমে। কেউ ক্রয় অর্ডার (Buy Order) দেয় একটি দামে, কেউ বিক্রয় অর্ডার (Sell Order) দেয় অন্য দামে। দুই দাম মিলে গেলে লেনদেন হয়।
কিছু বুনিয়াদি শব্দ এখনই জেনে রাখা ভালো:
| শব্দ | সহজ অর্থ |
|---|---|
| ফেস ভ্যালু (Face Value) | শেয়ারের কাগুজে মূল্য। আমাদের বাজারে সাধারণত ১০ টাকা। বাজারদরের সঙ্গে এর সম্পর্ক নেই |
| বাজারদর (Market Price) | এখন বাজারে যে দামে শেয়ার হাতবদল হচ্ছে |
| লট (Lot/Marketable Lot) | নিম্নতম যে সংখ্যায় শেয়ার কেনা যায় |
| বিড/আস্ক (Bid/Ask) | ক্রেতা যে দাম দিতে রাজি (বিড), বিক্রেতা যে দাম চায় (আস্ক) |
| ওপেন, হাই, লো, ক্লোজ | দিনের শুরুর, সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও শেষ দাম |
| ভলিউম (Volume) | নির্দিষ্ট সময়ে হাতবদল হওয়া শেয়ারের সংখ্যা |
| টার্নওভার (Turnover) | সেই লেনদেনের মোট টাকার অঙ্ক |
| সার্কিট ব্রেকার (Circuit Breaker) | একদিনে দাম সর্বোচ্চ কতটা ওঠানামা করতে পারবে তার সীমা। নিয়ম সময়ে সময়ে বদলায় |
| ফ্লোর প্রাইস (Floor Price) | বিশেষ পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক যে নিচের সীমা বেঁধে দেন, তার নিচে দাম নামতে পারে না |
| সেটেলমেন্ট (Settlement, T+2) | কেনার পর শেয়ার আর টাকা বুঝে পেতে সাধারণত দুই কর্মদিবস লাগে |
| ক্যাটাগরি (A, B, N, Z) | কোম্পানির আর্থিক ও নিয়মনীতির অবস্থা বোঝাতে বাজারের ভাগ |
| সূচক (Index) | পুরো বাজারের স্বাস্থ্য মাপার থার্মোমিটার |
সূচক নিয়ে একটু বলি। ডিএসইর প্রধান তিনটি সূচক হলো ডিএসইএক্স (DSEX) যা বাজারের সব বড় কোম্পানি ধরে, ডিএস৩০ (DS30) যা বাছাই করা ৩০টি সেরা কোম্পানির, আর ডিএসইএস (DSES) যা শরিয়াহ-সম্মত কোম্পানির। টেলিভিশনে "আজ সূচক ৫০ পয়েন্ট বাড়ল" শুনলে বুঝবে, বাজারের সামগ্রিক অবস্থা ভালোর দিকে।
ক্যাটাগরি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা: A হলো নিয়মিত বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করে এবং ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেয় এমন কোম্পানি। B হলো লভ্যাংশ ১০ শতাংশের কম। N নতুন তালিকাভুক্ত। Z হলো যারা নিয়ম মানছে না, লভ্যাংশ দিচ্ছে না, অথবা বন্ধ হওয়ার মুখে। নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য Z ক্যাটাগরি সাধারণত ঝুঁকির লাল পতাকা। বিস্তারিত নিয়ম বদলায়, তাই কেনার আগে ডিএসইর বর্তমান নিয়ম দেখে নিও।
কীভাবে টাকা আসে? দুই পথ
মিজান চাচা বললেন, "শেয়ার থেকে টাকা আসে দুভাবে।"
১. লভ্যাংশ (Dividend): কোম্পানি লাভ করলে মালিকদের মধ্যে কিছু অংশ ভাগ করে দেয়। এটা হতে পারে নগদ লভ্যাংশ (Cash Dividend), মানে সরাসরি টাকা, অথবা বোনাস শেয়ার (Stock Dividend), মানে আরও শেয়ার। লভ্যাংশ পেতে হলে রেকর্ড ডেট (Record Date) এর আগে শেয়ার তোমার বিও অ্যাকাউন্টে থাকতে হবে। কোম্পানি এই তারিখের পর শেয়ারটি এক্স-ডিভিডেন্ড (Ex-dividend) করে দেয়।
২. মূলধনী মুনাফা (Capital Gain): কম দামে কিনে বেশি দামে বেচলে যে পার্থক্য, সেটাই। উল্টো হলে হয় মূলধনী ক্ষতি (Capital Loss)।
তানভীর জানতে চাইল, "তাহলে কোন শেয়ার কিনব, আর কখন কিনব?"
মিজান চাচা বললেন, "ঠিক এই দুই প্রশ্নের উত্তরেই দুটো আলাদা চোখ আছে। একটা কোম্পানির ভেতরটা দেখে, আরেকটা দামের চলাচল দেখে। আগে দেখো দুটো কী।"
অধ্যায় ২: দুটি চোখ, ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল
"ধরো, তুমি একটা বাড়ি কিনবে," চাচা বললেন। "প্রথমে কী দেখবে?"
"বাড়ির মজবুততা, জমির কাগজ, এলাকা, ভাড়া কেমন আসবে।"
"এটাই ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস (Fundamental Analysis)। বাড়ির, মানে কোম্পানির, আসল মূল্য কত তা খুঁজে বের করা। তারপর কী দেখবে?"
"বাজারে এখন ওই এলাকায় বাড়ির দাম বাড়ছে না কমছে, ক্রেতা বেশি না বিক্রেতা বেশি।"
"এটাই টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস (Technical Analysis)। দামের ইতিহাস আর ক্রেতা-বিক্রেতার আচরণ পড়ে সঠিক সময় বের করা।"
| ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস | টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস | |
|---|---|---|
| মূল প্রশ্ন | কী কিনব? কোম্পানিটি কি ভালো? | কখন কিনব বা বেচব? |
| কী দেখে | আর্থিক বিবরণী, ব্যবসা, ম্যানেজমেন্ট, অর্থনীতি | দামের চার্ট, ভলিউম, ইন্ডিকেটর |
| সময়কাল | সাধারণত মাস থেকে বছর | দিন থেকে সপ্তাহ বা মাস |
| ধারণা | দাম শেষমেশ আসল মূল্যের কাছে ফিরবে | দামের মধ্যে সব তথ্য ইতিমধ্যে ধরা আছে, আর ইতিহাস আকারে ফেরে |
| উপমা | গাড়ির ইঞ্জিন পরীক্ষা | রাস্তার ট্রাফিক দেখা |
চাচা বললেন, "মনে রেখো, এ দুটো প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। ফান্ডামেন্টাল বলে ভালো গাড়ি কোনটা, টেকনিক্যাল বলে কখন রওনা দিলে সবুজ বাতি পাবে। আমি আগে ফান্ডামেন্টাল দিয়ে ছাঁকি, তারপর টেকনিক্যাল দিয়ে সময় ঠিক করি।"
তানভীর খাতা খুলল। "তাহলে প্রথমে ফান্ডামেন্টাল।"
অধ্যায় ৩: ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিস, কোম্পানির স্বাস্থ্য পরীক্ষা
ধাপ ১: তিনটি আর্থিক বিবরণী পড়তে শেখো
"ডাক্তার রোগীর রক্ত পরীক্ষা করে," চাচা বললেন। "কোম্পানির রক্ত পরীক্ষা হলো তার আর্থিক বিবরণী (Financial Statements)। মোট তিনটি।"
১. আয় বিবরণী (Income Statement / Profit & Loss): এই বছরে কত বিক্রি হলো, কত খরচ হলো, শেষে কত লাভ থাকল। ওপর থেকে নিচে নামলে দেখবে: রাজস্ব (Revenue/Sales) থেকে পণ্য তৈরির খরচ (COGS) বাদ দিলে মোট মুনাফা (Gross Profit), তা থেকে পরিচালন খরচ বাদ দিলে পরিচালন মুনাফা (Operating Profit/EBIT), তা থেকে সুদ ও কর বাদ দিলে নিট মুনাফা (Net Profit)।
২. স্থিতিপত্র (Balance Sheet): নির্দিষ্ট একটি দিনে কোম্পানির কাছে কী আছে (সম্পদ, Assets), কার কাছে কত দেনা (দায়, Liabilities), আর মালিকদের নিজের টাকা কত (ইক্যুইটি, Equity)। সূত্রটা সবসময় মেলে:
সম্পদ (Assets) = দায় (Liabilities) + ইক্যুইটি (Equity)
৩. নগদ প্রবাহ বিবরণী (Cash Flow Statement): বছরে আসলে কত নগদ টাকা ঢুকল আর বেরোল। খাতায় লাভ দেখানো যায়, কিন্তু নগদ টাকা না এলে কোম্পানি বিপদে পড়ে। এর তিনটি অংশ: পরিচালন কার্যক্রম (Operating), বিনিয়োগ কার্যক্রম (Investing), অর্থায়ন কার্যক্রম (Financing)।
চাচা বললেন, "অনেক প্রতারণা খাতার লাভে লুকিয়ে থাকে, কিন্তু নগদ প্রবাহে ধরা পড়ে। লাভ দেখায় অথচ পরিচালন কার্যক্রম থেকে নগদ আসছে না, এমন কোম্পানি দেখলে সাবধান হবে।"
এখন কিছু শব্দ, যা বিবরণীতে বারবার আসে: পরিশোধিত মূলধন (Paid-up Capital) হলো মালিকদের দেওয়া মূল টাকা। রিজার্ভ ও সারপ্লাস (Reserve & Surplus) বা সঞ্চিত মুনাফা (Retained Earnings) হলো আগে আয় করে লভ্যাংশ না দিয়ে জমানো টাকা। বুক ভ্যালু (Book Value) হলো সম্পদ থেকে দায় বাদ দিলে যা থাকে।
ধাপ ২: সংখ্যাকে মাপকাঠিতে বদলাও, অনুপাত বা রেশিও
"বিবরণী পড়ে কী হবে," তানভীর বলল, "অঙ্কই তো অঙ্কই!"
"ঠিক। তাই সংখ্যাকে তুলনাযোগ্য করতে আমরা অনুপাত (Ratio) বানাই। এক কোম্পানির লাভ ৫০ কোটি আর আরেকটির ৫ কোটি, এ থেকে বোঝা যায় না কোনটা ভালো। কিন্তু কে কত মূলধনে কত আয় করছে, সেটা বোঝা যায়।"
চাচা একটা কাল্পনিক কোম্পানি ধরলেন: আলফা টেক্সটাইল লিমিটেড। তার তথ্য:
| তথ্য | মান |
|---|---|
| মোট শেয়ার | ৮ কোটি (ফেস ভ্যালু ১০ টাকা, তাই পরিশোধিত মূলধন ৮০ কোটি) |
| বার্ষিক রাজস্ব | ৩০০ কোটি টাকা |
| পরিচালন মুনাফা (EBIT) | ৪৮ কোটি টাকা |
| সুদ খরচ | ১২ কোটি টাকা |
| নিট মুনাফা | ২৪ কোটি টাকা |
| মোট সম্পদ | ৬০০ কোটি টাকা |
| মোট ঋণ | ১৫০ কোটি টাকা |
| মালিকানা মূলধন (ইক্যুইটি) | ৩০৪ কোটি টাকা |
| চলতি সম্পদ / চলতি দায় | ২০০ / ১২৫ কোটি টাকা |
| নগদ লভ্যাংশ | শেয়ারপ্রতি ১.৫০ টাকা |
| বর্তমান বাজারদর | ৪৫ টাকা |
এবার একটা একটা করে মাপকাঠি বের করি।
ক) আয় ও মুনাফার মাপকাঠি
ইপিএস (EPS, Earnings Per Share, শেয়ারপ্রতি আয়): কোম্পানির মোট নিট মুনাফা কত শেয়ারে ভাগ হলো। এটা সবচেয়ে মৌলিক সংখ্যা।
EPS = নিট মুনাফা ÷ মোট শেয়ার সংখ্যা = ২৪ কোটি ÷ ৮ কোটি = ৩.০০ টাকা
নিট মুনাফার হার (Net Profit Margin): প্রতি ১০০ টাকা বিক্রিতে কত লাভ থাকে। এখানে ২৪ ÷ ৩০০ = ৮%। একইভাবে মোট মুনাফার হার (Gross Margin) ও পরিচালন মুনাফার হার (Operating Margin) বের করা যায়: ৪৮ ÷ ৩০০ = ১৬% পরিচালন মার্জিন। বছর বছর এই হার বাড়লে ব্যবসা দক্ষ হচ্ছে।
রাজস্ব প্রবৃদ্ধি (Revenue Growth) ও আয় প্রবৃদ্ধি (EPS Growth): গত বছরের তুলনায় বিক্রি আর আয় কত বাড়ল। আলফার ইপিএস গত বছর ২.৬০ টাকা থেকে বেড়ে ৩.০০ হয়েছে, মানে প্রায় ১৫% প্রবৃদ্ধি।
রিটার্ন অন ইক্যুইটি (ROE, Return on Equity): মালিকদের টাকায় কোম্পানি কত শতাংশ আয় করছে।
ROE = নিট মুনাফা ÷ ইক্যুইটি = ২৪ ÷ ৩০৪ ≈ ৭.৯%
রিটার্ন অন অ্যাসেটস (ROA): মোট সম্পদ কাজে লাগিয়ে কত লাভ: ২৪ ÷ ৬০০ = ৪%। আরেকটি হলো ROCE (Return on Capital Employed), মানে ঋণ ও ইক্যুইটি মিলিয়ে ব্যবহৃত মোট মূলধনে পরিচালন আয়।
ROE বেশি হলে সাধারণত ভালো। তবে ঋণ বাড়িয়েও ROE ফুলিয়ে দেখানো যায়, তাই ROE আলাদা করে না দেখে ঋণের অনুপাতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখো।
খ) মূল্যের মাপকাঠি, শেয়ারটা সস্তা না দামি?
পি/ই রেশিও (P/E, Price-to-Earnings): বর্তমান দাম আয়ের কত গুণ।
P/E = বাজারদর ÷ EPS = ৪৫ ÷ ৩ = ১৫
মানে, বর্তমান আয় একই থাকলে এই দামে কেনা টাকা আয় থেকে উঠে আসতে ১৫ বছর লাগবে। একই খাতের অন্য কোম্পানির গড় পি/ই ১৮ হলে আলফা তুলনায় সস্তা। মনে রেখো, পি/ই শুধু তুলনা করা যায় একই শিল্পখাতের কোম্পানির সঙ্গে। ব্যাংক আর টেক্সটাইলের পি/ই সোজাসুজি মেলানো ঠিক নয়।
ন্যাভ (NAV, Net Asset Value) বা শেয়ারপ্রতি সম্পদমূল্য (NAVPS): সব সম্পত্তি বেচে সব দেনা শোধ করলে শেয়ারপ্রতি কত টাকা থাকবে। ইক্যুইটি ৩০৪ কোটি ÷ ৮ কোটি শেয়ার = ৩৮ টাকা।
পি/বি রেশিও (P/B, Price-to-Book): বাজারদর ÷ NAV = ৪৫ ÷ ৩৮ ≈ ১.১৮। এক বা তার কাছাকাছি হলে দাম খাতার মূল্যের কাছাকাছি। এক-এর নিচে হলে সস্তা মনে হতে পারে, কিন্তু কেন সস্তা তা খুঁজে বের করতে হবে।
পিইজি রেশিও (PEG): পি/ই-কে আয় প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে ভাগ। ১৫ ÷ ১৫ = ১.০। এক-এর কাছাকাছি হলে প্রবৃদ্ধির তুলনায় দাম ন্যায্য, বেশি হলে দামি।
মার্কেট ক্যাপ (Market Cap, বাজার মূলধন): বাজারদর × মোট শেয়ার = ৪৫ × ৮ কোটি = ৩৬০ কোটি টাকা। এ দিয়ে কোম্পানি বড় না ছোট, লার্জ-ক্যাপ, মিড-ক্যাপ, স্মল-ক্যাপ বোঝা যায়।
ইভি/ইবিআইটিডিএ (EV/EBITDA): পুরো কোম্পানির দাম (ঋণসহ) বনাম তার সুদ-কর-অবচয়-পূর্ব আয়। সুদ, কর ও অবচয়ের ঝামেলা বাদ দিয়ে বিভিন্ন কোম্পানি তুলনার জন্য কাজে লাগে।
শেয়ারপ্রতি নগদ প্রবাহ (NOCFPS, Net Operating Cash Flow Per Share): আমাদের বাজারে বিশেষ জনপ্রিয় একটি সংখ্যা। ইপিএস যত, এটি তার কাছাকাছি বা বেশি হলে লাভ আসলে নগদ হয়ে আসছে।
গ) আর্থিক স্বাস্থ্যের মাপকাঠি, কোম্পানি কি ঋণে ডুবছে?
ঋণ-ইক্যুইটি অনুপাত (D/E, Debt-to-Equity): ১৫০ ÷ ৩০৪ ≈ ০.৪৯। ইক্যুইটির তুলনায় ঋণ অর্ধেকেরও কম, তাই নিরাপদ। ঋণ বেশি হলে কোম্পানি সুদের চাপে ভুগতে পারে।
চলতি অনুপাত (Current Ratio): চলতি সম্পদ ÷ চলতি দায় = ২০০ ÷ ১২৫ = ১.৬। এক-এর বেশি মানে স্বল্পমেয়াদি দেনা শোধ করার মতো সম্পদ আছে। এর কড়া সংস্করণ কুইক রেশিও (Quick Ratio), যাতে মজুত পণ্যকে হিসাবে ধরা হয় না।
সুদ কাভারেজ (Interest Coverage): পরিচালন মুনাফা ÷ সুদ খরচ = ৪৮ ÷ ১২ = ৪ গুণ। মানে আয় থেকে সুদ চার বার মেটানো যায়। ১.৫ গুণের নিচে নামলে বিপদ।
তারল্য (Liquidity) হলো হাতে নগদ বা নগদে রূপান্তরযোগ্য সম্পদ কতটা আছে, আর সল্ভেন্সি (Solvency) হলো দীর্ঘমেয়াদে সব দেনা মেটানোর ক্ষমতা।
ঘ) লভ্যাংশের মাপকাঠি
ডিভিডেন্ড ইয়িল্ড (Dividend Yield): ১.৫ ÷ ৪৫ = ৩.৩৩%, মানে দাম অনুযায়ী বছরে এই হারে নগদ ফেরত পাচ্ছ।
পেআউট রেশিও (Payout Ratio): আয়ের কত অংশ লভ্যাংশ হিসেবে দিয়ে দিচ্ছে। ১.৫ ÷ ৩ = ৫০%। বাকি অর্ধেক ব্যবসা বাড়াতে কোম্পানির কাছে থাকছে।
কোনো কোম্পানির লভ্যাংশ হঠাৎ আকাশচুম্বী হলে জানতে চাও, ব্যবসার আয় থেকে দিচ্ছে, না ধার করে বা সঞ্চয় ভেঙে? আয়ের চেয়ে লভ্যাংশ বেশি হলে, অর্থাৎ পেআউট রেশিও ১০০% ছাড়ালে, সেটা বেশিদিন টিকবে না।
ঙ) মালিকানার কাঠামো
বাজারে স্পনসর-ডিরেক্টর শেয়ারধারণ (Sponsor-Director Holding), প্রাতিষ্ঠানিক (Institutional), সরকারি (Government), বিদেশি (Foreign) ও সাধারণ জনগণ (Public) এর শেয়ারের হার পাওয়া যায়। ফ্রি ফ্লোট (Free Float) মানে সাধারণ মানুষের হাতে যে শেয়ার আছে। ফ্রি ফ্লোট খুব কম হলে সামান্য কেনাবেচায় দাম লাফায়, আর কারসাজির ঝুঁকিও বাড়ে। স্পনসররা নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিতে থাকলে সেটা একটি সতর্কসংকেত।
ধাপ ৩: কোম্পানির আসল মূল্য, ইনট্রিনসিক ভ্যালু
"এতক্ষণ সংখ্যা দেখলাম," তানভীর বলল। "কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি জানব কী করে ৪৫ টাকা ঠিক দাম কিনা?"
চাচা বললেন, "এখানে আসে ইনট্রিনসিক ভ্যালু (Intrinsic Value), অর্থাৎ কোম্পানির নিজস্ব ন্যায্য মূল্যের ধারণা। এর অনেক পদ্ধতি আছে, যেমন ডিসকাউন্টেড ক্যাশ ফ্লো (DCF, ভবিষ্যতের নগদ আয়কে আজকের মূল্যে এনে হিসাব) বা ডিভিডেন্ড ডিসকাউন্ট মডেল। নতুনদের জন্য সবচেয়ে সোজা একটা পথ আছে।"
ন্যায্য মূল্য ≈ EPS × ন্যায্য পি/ই
= ৩ × ১৮ (খাতের গড়) = ৫৪ টাকা
"বাজারদর ৪৫ টাকা, ন্যায্য মূল্য ৫৪ টাকা, তাহলে কি লাফ দিয়ে কিনে ফেলব?"
"না। এখানে আরেকটি ধারণা মাথায় রাখো, নিরাপত্তার ব্যবধান (Margin of Safety)। আমার হিসাব ভুল হতেই পারে। তাই ন্যায্য মূল্য থেকে অন্তত ২০% কমে কিনতে চাই। ৫৪ থেকে ২০% কমালে হয় প্রায় ৪৩ টাকা। আমি আরেকটু অপেক্ষা করব।"
অর্থাৎ, ভালো কোম্পানি বলেই যেকোনো দামে কেনা ঠিক নয়। ভালো কোম্পানিও অতিরিক্ত দামে কিনলে লোকসান হতে পারে।
ধাপ ৪: সংখ্যার বাইরের গুণগত বিশ্লেষণ
চাচা বললেন, "সংখ্যা দেখলে অতীত বোঝা যায়, ভবিষ্যৎ বোঝা যায় এই বিষয়গুলো দেখলে। একে বলে গুণগত বিশ্লেষণ (Qualitative Analysis), আর সংখ্যার বিশ্লেষণ পরিমাণগত (Quantitative)।"
- ব্যবসার ধরন: কোম্পানি আসলে কী বিক্রি করে? সে পণ্য কি মানুষ আগামী দশ বছরেও লাগবে?
- প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা বা অর্থনৈতিক পরিখা (Economic Moat, দুর্গের চারপাশের গভীর খাল): কেন প্রতিদ্বন্দ্বী তার ব্যবসা কেড়ে নিতে পারবে না? শক্তিশালী ব্র্যান্ড, কম খরচে উৎপাদন, একচেটিয়া লাইসেন্স, এসব হতে পারে পরিখা।
- ব্যবস্থাপনার সততা ও দক্ষতা: পরিচালকেরা আগে কেমন কাজ করেছেন? মামলা, অনিয়ম, বা লভ্যাংশ না দেওয়ার ইতিহাস আছে কি?
- নিরীক্ষকের মতামত (Auditor's Opinion): বহিঃনিরীক্ষক যদি "যোগ্যতাসম্পন্ন মত" (Qualified Opinion) দেন, মানে কোনো বিষয়ে আপত্তি তোলেন, সেটা বড় লাল পতাকা।
- শিল্পখাতের অবস্থা: ব্যাংক, ওষুধ, বস্ত্র, জ্বালানি, প্রকৌশল, প্রতিটি খাতের নিজস্ব চক্র আছে।
এবার বড় ছবিটা: সামষ্টিক অর্থনীতি (Macroeconomics)। সুদের হার বাড়লে ঋণ ব্যয়বহুল হয়, ব্যাংকের আমানতে আকর্ষণ বাড়ে, শেয়ার থেকে টাকা বেরিয়ে যেতে পারে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে ভোক্তার খরচ কমে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি (GDP Growth) বাড়লে সাধারণত কোম্পানির আয় বাড়ে। ডলারের বিনিময় হার আমদানিনির্ভর বা রপ্তানিনির্ভর কোম্পানির খরচ ও আয়কে সরাসরি বদলে দেয়। রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অর্থনীতির সামর্থ্যের ইঙ্গিত দেয়। নীতিগত পরিবর্তন, যেমন বাজেট ও কর, কোনো খাতের মুনাফা বাড়াতে বা কমাতে পারে।
দুটি পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা যায়:
- টপ-ডাউন (Top-Down): আগে অর্থনীতি দেখো, তারপর ভালো শিল্পখাত বাছো, শেষে সেই খাতের সেরা কোম্পানি।
- বটম-আপ (Bottom-Up): আগে ভালো কোম্পানি খুঁজে নাও, তারপর দেখো তার শিল্প ও অর্থনীতি তাকে সমর্থন করছে কিনা।
আর বিনিয়োগের দর্শনেও দুই রকম মানুষ আছে। ভ্যালু ইনভেস্টর (Value Investor) এমন কোম্পানি খোঁজে যার দাম ন্যায্য মূল্যের চেয়ে কম। গ্রোথ ইনভেস্টর (Growth Investor) এমন কোম্পানি খোঁজে যার আয় দ্রুত বাড়ছে, দাম একটু বেশি হলেও। দুই পথেই সফল মানুষ আছেন, দরকার নিজের ধাত বোঝা।
ধাপ ৫: সাবধানবাণী, লাল পতাকা
চাচা শেষে তানভীরকে একটা তালিকা ধরিয়ে দিলেন:
- বছরের পর বছর আয় নেই, অথচ শেয়ারের দাম আকাশে
- নিট মুনাফা আছে কিন্তু পরিচালন নগদ প্রবাহ নেগেটিভ
- ঋণ ক্রমাগত বাড়ছে, সুদ কাভারেজ কমছে
- পরিচালকেরা ধারাবাহিকভাবে শেয়ার বেচছেন
- নিরীক্ষকের আপত্তি, ঘন ঘন নিরীক্ষক বদল
- হঠাৎ করে ফ্রি ফ্লোট কম, দাম অস্বাভাবিক লাফ, আর খবরের নামে গুজব
- ক্যাটাগরি Z বা অনিয়মিত এজিএম
"এই তালিকার অনেকগুলো মিললে ছেড়ে দাও," চাচা বললেন। "বাজারে কোম্পানির অভাব নেই।"
তানভীর মাথা নেড়ে বলল, "বুঝলাম, কোম্পানি বাছাই করতে শিখলাম। কিন্তু কখন কিনব?"
মিজান চাচার চোখ চকচক করে উঠল। "এখান থেকেই আসল মজা শুরু। এবার দ্বিতীয় চোখটা খুলি।"
অধ্যায় ৪: টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস, চার্টের ভাষা
"চার্ট জিনিসটা প্রথমে আমারও ভয় লাগত," চাচা বললেন। "মনে হতো দুর্বোধ্য কোনো ম্যাপ। আসলে এটা শুধু ক্রেতা আর বিক্রেতার লড়াইয়ের ইতিহাস। কে কখন জিতেছে, তার হিসাব।"
টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস তিনটি ধারণার ওপর দাঁড়িয়ে (এগুলো ডাও থিওরি, Dow Theory-র ভিত্তি থেকে এসেছে):
১. দামের মধ্যে সব তথ্য ধরা আছে। কোম্পানির আয়, খবর, গুজব, মানুষের ভয়-লোভ, সবই শেষ পর্যন্ত দামে ফুটে ওঠে। ২. দাম ধারা বা ট্রেন্ড মেনে চলে। একবার দিক ঠিক হলে সেদিকেই চলতে থাকে, যতক্ষণ না কিছু তাকে ঘোরায়। ৩. ইতিহাস নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে। মানুষের মনস্তত্ত্ব বদলায় না, তাই একই চার্ট প্যাটার্ন বারবার ফিরে আসে।
চার্টের তিন রকম
- লাইন চার্ট (Line Chart): শুধু প্রতিদিনের ক্লোজিং দাম জুড়ে একটি রেখা। সবচেয়ে সোজা, কিন্তু তথ্য কম।
- বার চার্ট (OHLC Bar Chart): প্রতিটি দিনের ওপেন, হাই, লো, ক্লোজ চারটি তথ্য একটি দণ্ডে।
- ক্যান্ডেলস্টিক চার্ট (Candlestick Chart): বার চার্টের মতো একই চার তথ্য, কিন্তু দেখতে মোমবাতির মতো, আর এক নজরেই বোঝা যায় দিনটি ভালো না খারাপ। আমাদের আলোচনার প্রধান বিষয় এটাই।
এছাড়া হেইকিন-আশি (Heikin-Ashi) নামে একটি মসৃণ ক্যান্ডেল আছে, যা গড় দিয়ে বানানো, ট্রেন্ড বোঝার জন্য ভালো। এখনকার সব চার্ট সফটওয়্যারে টাইমফ্রেম (Timeframe) বদলানো যায়: ১ মিনিট, ১৫ মিনিট, ১ ঘণ্টা, দৈনিক (Daily), সাপ্তাহিক (Weekly), মাসিক (Monthly)। প্রতিটি ক্যান্ডেল সেই মেয়াদের গল্প বলে। নতুনদের জন্য পরামর্শ: দৈনিক ও সাপ্তাহিক দিয়ে শুরু করো। ছোট টাইমফ্রেমে শব্দ বেশি, সত্যি কম।
ট্রেন্ড, বাজারের দিক
দাম কখনো সোজা চলে না, ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে। প্রতিটি ঢেউয়ের চূড়াকে বলে সুইং হাই (Swing High), আর খাদকে সুইং লো (Swing Low)। এই চূড়া আর খাদের সজ্জা দেখে তিন রকম ট্রেন্ড বোঝা যায়:
- আপট্রেন্ড (Uptrend): ক্রমাগত উঁচু হাই ও উঁচু লো (Higher High, Higher Low)। ক্রেতারা শক্তিশালী। এমন বাজারকে বলে বুল মার্কেট (Bull Market, ষাঁড়ের শিং ওপরে ওঠে বলে)।
- ডাউনট্রেন্ড (Downtrend): নিচু হাই ও নিচু লো (Lower High, Lower Low)। বিক্রেতারা প্রবল। এটা বেয়ার মার্কেট (Bear Market, ভালুক থাবা নিচে নামায় বলে)।
- সাইডওয়েজ বা রেঞ্জ (Sideways/Range): একই ওপর-নিচ সীমার মধ্যে ঘোরাফেরা, কেউ জিতছে না।
ডাও থিওরি অনুযায়ী ট্রেন্ড আবার তিন মাপের হয়: প্রাথমিক (Primary, মাস থেকে বছর), মাধ্যমিক (Secondary, সপ্তাহ থেকে মাস, বড় ঢেউয়ের মধ্যে সাময়িক উল্টো টান), আর ক্ষুদ্র (Minor, কয়েক দিন)। "ট্রেন্ড তোমার বন্ধু" কথাটার মানে, বড় ট্রেন্ডের বিপরীতে লড়তে যেও না।
সাপোর্ট ও রেজিস্ট্যান্স, দামের মেঝে আর ছাদ
মিজান চাচা বললেন, "দাম একটা বলের মতো। ঘরে বল ছুড়লে কখনো মেঝেতে লাগে, কখনো ছাদে।"
- সাপোর্ট (Support): যে দামের কাছে এসে ক্রেতারা বারবার ঝাঁপিয়ে পড়ে, ফলে দাম আর নামে না। এটি মেঝে।
- রেজিস্ট্যান্স (Resistance): যে দামের কাছে এসে বিক্রেতারা বারবার বিক্রি শুরু করে, ফলে দাম আর ওঠে না। এটি ছাদ।
যত বেশি বার কোনো স্তর কাজ করে, সেটি তত শক্তিশালী। আর এখানেই এক মজার নিয়ম: ছাদ ভেঙে উঠে গেলে সেই ছাদ নতুন মেঝে হয়ে যায়, আবার মেঝে ভেঙে নামলে সেটি নতুন ছাদ। একে বলে রোল রিভার্সাল (Role Reversal)।
কিছু আরও সংশ্লিষ্ট শব্দ:
- ব্রেকআউট (Breakout): দাম ছাদ ভেদ করে ওপরে উঠে গেল। ব্রেকডাউন (Breakdown): মেঝে ভেঙে নিচে নামল। সাধারণত ভলিউম বেশি হলে এ ভাঙা বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
- ফলস ব্রেকআউট বা ফেকআউট (False Breakout/Fakeout): ভাঙার ভান করে দাম ফিরে এল। নতুনদের সবচেয়ে বেশি ঠকায় এটাই। তাই ভাঙার পর ক্যান্ডেল ক্লোজ পর্যন্ত অপেক্ষা করা ভালো অভ্যাস।
- পুলব্যাক বা রিটেস্ট (Pullback/Retest): ভাঙার পর দাম একটু ফিরে এসে পুরোনো ছাদ (নতুন মেঝে) পরীক্ষা করে আবার চলে যায়।
- ট্রেন্ডলাইন (Trendline): আপট্রেন্ডে খাদগুলো জুড়ে একটি ঢালু রেখা, ডাউনট্রেন্ডে চূড়াগুলো জুড়ে। আর দুটি সমান্তরাল ট্রেন্ডলাইনের মধ্যে দামের চলাকে বলে চ্যানেল (Channel)।
- গ্যাপ (Gap): আগের দিনের ক্লোজ ও পরের দিনের ওপেনের মধ্যে ফাঁকা জায়গা, সাধারণত বড় খবরে হয়। ব্রেকঅ্যাওয়ে গ্যাপ ট্রেন্ডের শুরুতে, রানঅ্যাওয়ে গ্যাপ মাঝপথে, আর এক্সহশন গ্যাপ শেষ দিকে ঘটে।
ভলিউম, দামের পেছনের শক্তি
"দাম ওঠা দেখে খুশি হয়ো না," চাচা বললেন। "দেখো কতজন মিলে উঠছে।"
ভলিউম (Volume) হলো দামের সত্যতার প্রমাণ। দাম বাড়ছে আর ভলিউমও বাড়ছে, মানে অনেকে এ চালে বিশ্বাস করছে, ট্রেন্ড শক্তিশালী। দাম বাড়ছে কিন্তু ভলিউম কমছে, মানে ক্রেতারা ক্লান্ত, চালটা দুর্বল। ব্রেকআউটের সময় ভলিউম বাড়া মানে সংকেত বেশি নির্ভরযোগ্য।
বাজার বোঝার জন্য মার্কেট ব্রেডথ (Market Breadth) দেখাও কাজের: অ্যাডভান্স/ডিক্লাইন (Advance/Decline) অর্থাৎ কতগুলো শেয়ারের দাম বেড়েছে বনাম কমেছে। সূচক বাড়ছে অথচ বেশিরভাগ শেয়ার কমছে, মানে হাতে-গোনা কয়েকটি বড় শেয়ারের জোরে সূচক বাড়ছে, ভিত দুর্বল।
তানভীর বলল, "বুঝলাম, চার্ট জিনিসটা তাহলে ক্রেতা-বিক্রেতার টানাটানির ছবি। কিন্তু ক্যান্ডেলস্টিক কী, আর কেন বলে সবাই এত কথা?"
অধ্যায় ৫: ক্যান্ডেলস্টিক, মোমবাতির ভাষা
চাচা বললেন, "ক্যান্ডেলস্টিকের জন্ম জাপানে, প্রায় তিনশ বছর আগে। মুনেহিসা হোমা নামে এক চালের ব্যবসায়ী দেখেছিলেন, চালের দাম শুধু জোগান-চাহিদায় নয়, ব্যবসায়ীদের আবেগেও ওঠানামা করে। সেই আবেগ ধরার জন্য তিনি এই ছবি আঁকা শুরু করেন। আজ পৃথিবীর প্রায় সব ট্রেডার এটি ব্যবহার করে।"
একটি ক্যান্ডেলের গঠন
প্রতিটি ক্যান্ডেল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের চারটি তথ্য বলে: ওপেন (Open), হাই (High), লো (Low), ক্লোজ (Close), সংক্ষেপে OHLC।
- বডি (Body): ওপেন আর ক্লোজের মধ্যের মোটা অংশ।
- সলতে (Wick বা Shadow): বডির ওপরে-নিচে সরু রেখা, যা দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পর্যন্ত যায়। ওপরেরটি আপার শ্যাডো (Upper Shadow), নিচেরটি লোয়ার শ্যাডো (Lower Shadow)।
- বুলিশ ক্যান্ডেল (Bullish): ক্লোজ ওপেনের চেয়ে বেশি, মানে ক্রেতারা জিতেছে। আমাদের বাজারে (এবং এই লেখায়) রং সবুজ।
- বেয়ারিশ ক্যান্ডেল (Bearish): ক্লোজ ওপেনের চেয়ে কম, মানে বিক্রেতারা জিতেছে। রং লাল।
রঙের নিয়ম সব জায়গায় এক নয়। পূর্ব এশিয়ার কিছু বাজারে উল্টো রং চলে (লাল মানে দাম বাড়া)। তোমার চার্ট সফটওয়্যারে রঙের সেটিং আগে দেখে নিও।
ক্যান্ডেল পড়ার তিনটি সূত্র মনে রাখো:
১. বড় বডি মানে একপক্ষের জোরালো আধিপত্য, ছোট বডি মানে দ্বিধা বা ভারসাম্য। ২. লম্বা সলতে মানে ওই দিকে একবার ঠেলে গিয়েও দাম ফিরে এসেছে, মানে ওই দিকের শক্তি প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ৩. প্যাটার্নের গুরুত্ব নির্ভর করে কোথায় তৈরি হলো তার ওপর। একই ক্যান্ডেল ট্রেন্ডের শেষে অর্থবহ, মাঝখানে প্রায় অর্থহীন। তাই প্যাটার্নের আগে দেখো সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স ও আগের ট্রেন্ড।
এই লেখার ছবিগুলোতে ছায়াঢাকা ফিকে ক্যান্ডেল হলো আগের প্রেক্ষাপট (Context), আর লাল ড্যাশ দেওয়া বাক্সের ভেতরেরটা মূল প্যাটার্ন।
ক) একক ক্যান্ডেলের প্যাটার্ন
মারুবোজু, পূর্ণ আধিপত্য
জাপানি ভাষায় "মারুবোজু" মানে "কামানো মাথা", অর্থাৎ সলতে নেই। দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একপক্ষই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
বুলিশ মারুবোজু ঊর্ধ্বমুখী চালের শক্তি বোঝায়, বেয়ারিশ মারুবোজু বিক্রেতার একচ্ছত্র দাপট। বিশেষত সাপোর্ট বা রেজিস্ট্যান্স ভেঙে এমন ক্যান্ডেল তৈরি হলে সেই ভাঙাটা বেশি বিশ্বাসযোগ্য।
ডোজি, দ্বিধার ছবি
ডোজির ওপেন আর ক্লোজ প্রায় সমান, ফলে বডি প্রায় নেই, শুধু একটা কাটা-চিহ্ন। ক্রেতা ও বিক্রেতা সমানে সমান লড়েছে, কেউ জেতেনি। ট্রেন্ডের শেষে ডোজি দেখা গেলে বুঝতে হবে, চলমান ধারা ক্লান্ত।
ডোজির চার রকমফের:
- স্ট্যান্ডার্ড ডোজি: ওপরে-নিচে সমান ছোট সলতে।
- লং-লেগড ডোজি (Long-Legged Doji): দুই দিকেই লম্বা সলতে, বাজারে প্রচণ্ড অনিশ্চয়তা।
- ড্রাগনফ্লাই ডোজি (Dragonfly): শুধু নিচে লম্বা সলতে, বিক্রেতারা নামিয়েছিল কিন্তু ক্রেতারা ফিরিয়ে এনেছে। সাপোর্টের কাছে হলে বুলিশ ইঙ্গিত।
- গ্রেভস্টোন ডোজি (Gravestone): শুধু ওপরে লম্বা সলতে, ক্রেতারা ওঠালেও বিক্রেতারা নামিয়ে এনেছে। রেজিস্ট্যান্সের কাছে হলে বেয়ারিশ ইঙ্গিত।
স্পিনিং টপ
ছোট বডি আর দুই দিকে সলতে। ডোজির মতোই দ্বিধা, তবে বডি একটু বড়। একা এর বিশেষ অর্থ নেই, ট্রেন্ডের পরে এলে ক্লান্তির সংকেত।
হ্যামার ও হ্যাংগিং ম্যান
এ দুটির চেহারা একই: ছোট বডি ওপরের দিকে, আর বডির অন্তত দ্বিগুণ লম্বা নিচের সলতে, যেন একটা হাতুড়ি। পার্থক্য হলো কোথায় তৈরি হলো।
- হ্যামার (Hammer) আসে নিম্নমুখী ট্রেন্ডের শেষে। বিক্রেতারা নিচে ঠেলেছিল, কিন্তু ক্রেতারা ঘুরিয়ে ওপরে নিয়ে এসেছে। বুলিশ রিভার্সালের ইঙ্গিত।
- হ্যাংগিং ম্যান (Hanging Man) আসে ঊর্ধ্বমুখী ট্রেন্ডের শেষে। ওই দিন বিক্রেতারা বেশ নামাতে পেরেছিল, শুধু ক্রেতারা সামলে নিয়েছে। পরের দিন নিচে বন্ধ হলে বেয়ারিশ রিভার্সালের সতর্কতা।
ইনভার্টেড হ্যামার ও শুটিং স্টার
এ দুটিও একই চেহারার: ছোট বডি নিচে, লম্বা ওপরের সলতে।
- ইনভার্টেড হ্যামার (Inverted Hammer) নিম্নমুখী ট্রেন্ডের শেষে, ক্রেতাদের প্রথম চেষ্টা। পরের দিন ওপরে বন্ধ হলে বুলিশ নিশ্চিতকরণ।
- শুটিং স্টার (Shooting Star) ঊর্ধ্বমুখী ট্রেন্ডের শেষে। দাম উঁচুতে উঠে ফিরে এসেছে, ক্রেতারা হেরে গেছে। বেয়ারিশ রিভার্সাল।
নিশ্চিতকরণ (Confirmation) শব্দটা মনে রেখো। একটি ক্যান্ডেল শুধু ইঙ্গিত দেয়। পরের ক্যান্ডেল সেই ইঙ্গিতকে সমর্থন করলে তবেই সংকেত পাকা হয়।
খ) দুই ক্যান্ডেলের প্যাটার্ন
এনগালফিং, গিলে ফেলা
দ্বিতীয় ক্যান্ডেলের বডি পুরোপুরি প্রথমটির বডিকে ঢেকে ফেলে। এটি রিভার্সালের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নির্ভরযোগ্য প্যাটার্নগুলোর একটি।
- বুলিশ এনগালফিং (Bullish Engulfing): ডাউনট্রেনের শেষে ছোট লালকে বড় সবুজ গিলে ফেলে। ক্রেতারা বিক্রেতাদের দখল থেকে নিয়ন্ত্রণ ছিনিয়ে নিয়েছে।
- বেয়ারিশ এনগালফিং (Bearish Engulfing): আপট্রেনের শেষে ছোট সবুজকে বড় লাল গিলে ফেলে।
পিয়ার্সিং লাইন ও ডার্ক ক্লাউড কভার
এনগালফিংয়ের দুর্বল সংস্করণ, দ্বিতীয় ক্যান্ডেল প্রথমটিকে পুরো গিলতে পারে না, কিন্তু অর্ধেকের বেশি ফেরত নেয়।
- পিয়ার্সিং লাইন (Piercing Line): ডাউনট্রেনে বড় লাল ক্যান্ডেলের পরে নিচে খুলে সবুজ ক্যান্ডেল শুরু হয়ে প্রথমটির অর্ধেকের ওপরে বন্ধ হয়। বুলিশ।
- ডার্ক ক্লাউড কভার (Dark Cloud Cover): আপট্রেনে বড় সবুজের পর ওপরে খুলে লাল ক্যান্ডেল প্রথমটির অর্ধেকের নিচে বন্ধ হয়। বেয়ারিশ।
হারামি, গর্ভবতী
জাপানি "হারামি" মানে গর্ভবতী। বড় ক্যান্ডেলের ভেতরে ছোট একটি ক্যান্ডেল, যেন পেটের ভেতর বাচ্চা। বড় ক্যান্ডেলের জোর ফুরিয়ে আসছে, এটি তার ইঙ্গিত।
- বুলিশ হারামি: বড় লাল ক্যান্ডেলের ভেতরে ছোট সবুজ।
- বেয়ারিশ হারামি: বড় সবুজের ভেতরে ছোট লাল।
- হারামি ক্রস (Harami Cross): ভেতরের ক্যান্ডেলটি ডোজি হলে সংকেত আরও জোরালো।
টুইজার টপ ও টুইজার বটম
চিমটার দুই মাথার মতো পরপর দুটি ক্যান্ডেলের হাই (বা লো) প্রায় সমান।
- টুইজার টপ (Tweezer Top): ওপরে একই জায়গা থেকে দুবার প্রত্যাখ্যাত, আপট্রেনের শেষে বেয়ারিশ।
- টুইজার বটম (Tweezer Bottom): নিচে একই জায়গা থেকে দুবার ফিরে আসা, ডাউনট্রেনের শেষে বুলিশ।
গ) তিন ক্যান্ডেলের প্যাটার্ন
তিন ক্যান্ডেলের প্যাটার্ন সাধারণত বেশি নির্ভরযোগ্য, কারণ ট্রেন্ড বদলের গল্পটা পুরো তিন অঙ্কে বলা হয়।
মর্নিং স্টার ও ইভনিং স্টার
- মর্নিং স্টার (Morning Star): ডাউনট্রেনের শেষে ১) বড় লাল ক্যান্ডেল, ২) নিচে গ্যাপ করে ছোট ক্যান্ডেল (বা ডোজি) যেখানে বিক্রেতা ক্লান্ত, ৩) বড় সবুজ ক্যান্ডেল যা প্রথমটির অর্ধেকের ওপরে উঠে আসে। ভোরের তারা মানে রাত শেষ। বুলিশ রিভার্সাল।
- ইভনিং স্টার (Evening Star): উল্টোটা। আপট্রেনের শেষে বড় সবুজ, ওপরে ছোট ক্যান্ডেল, তারপর বড় লাল। সন্ধ্যার তারা মানে দিন শেষ। বেয়ারিশ রিভার্সাল।
মাঝের ক্যান্ডেলটি ডোজি হলে নাম হয় মর্নিং ডোজি স্টার বা ইভনিং ডোজি স্টার। দুই পাশেই গ্যাপসহ ডোজি হলে তাকে বলে অ্যাবান্ডনড বেবি (Abandoned Baby), যা বিরল কিন্তু খুবই শক্তিশালী রিভার্সাল।
থ্রি হোয়াইট সোলজার্স ও থ্রি ব্ল্যাক ক্রোজ
- থ্রি হোয়াইট সোলজার্স (Three White Soldiers): পরপর তিনটি বড় সবুজ ক্যান্ডেল, প্রতিটি আগেরটির ভেতরে খুলে আগেরটির চেয়ে উঁচুতে বন্ধ হয়। ক্রেতাদের ধারাবাহিক আক্রমণ, শক্তিশালী বুলিশ সংকেত।
- থ্রি ব্ল্যাক ক্রোজ (Three Black Crows): পরপর তিনটি লাল ক্যান্ডেল, প্রতিটি আগেরটির চেয়ে নিচে বন্ধ হয়। বিক্রেতাদের ধারাবাহিক আক্রমণ, শক্তিশালী বেয়ারিশ সংকেত।
থ্রি ইনসাইড আপ/ডাউন
হারামি প্যাটার্নের পর তৃতীয় ক্যান্ডেল যেদিকে রিভার্সাল সেদিকে প্রথম ক্যান্ডেলের সীমা পার করলে হয় থ্রি ইনসাইড আপ (Three Inside Up, বুলিশ) বা থ্রি ইনসাইড ডাউন (Three Inside Down, বেয়ারিশ)। এটা হারামির নিশ্চিতকরণ।
রাইজিং থ্রি মেথডস ও ফলিং থ্রি মেথডস
এ দুটি রিভার্সালের নয়, ট্রেন্ড চালিয়ে যাওয়ার (Continuation) প্যাটার্ন।
- রাইজিং থ্রি মেথডস (Rising Three Methods): আপট্রেনে বড় সবুজ ক্যান্ডেল, তারপর তিনটি ছোট লাল ক্যান্ডেল, যেগুলো প্রথম ক্যান্ডেলের হাই-লোর ভেতরেই থাকে। বিক্রেতারা চেষ্টা করেছিল, পারেনি। তারপর আরেকটি বড় সবুজ ক্যান্ডেল ট্রেন্ড আবার শুরু করে।
- ফলিং থ্রি মেথডস (Falling Three Methods): ঠিক উল্টো, ডাউনট্রেন চলতে থাকে।
ক্যান্ডেল প্যাটার্নের সারসংক্ষেপ
| প্যাটার্ন | ক্যান্ডেল সংখ্যা | কোথায় দেখা যায় | ইঙ্গিত |
|---|---|---|---|
| মারুবোজু | ১ | যেকোনো জায়গায় | ট্রেন্ডের শক্তি বা ব্রেকআউটের জোর |
| ডোজি (ও চার রূপ) | ১ | ট্রেন্ডের শেষে | দ্বিধা, ট্রেন্ড ক্লান্ত |
| স্পিনিং টপ | ১ | ট্রেন্ডের শেষে | দ্বিধা |
| হ্যামার | ১ | ডাউনট্রেনের শেষে | বুলিশ রিভার্সাল |
| হ্যাংগিং ম্যান | ১ | আপট্রেনের শেষে | বেয়ারিশ সতর্কতা |
| ইনভার্টেড হ্যামার | ১ | ডাউনট্রেনের শেষে | সম্ভাব্য বুলিশ |
| শুটিং স্টার | ১ | আপট্রেনের শেষে | বেয়ারিশ রিভার্সাল |
| বুলিশ/বেয়ারিশ এনগালফিং | ২ | ট্রেন্ডের শেষে | জোরালো রিভার্সাল |
| পিয়ার্সিং লাইন / ডার্ক ক্লাউড | ২ | ট্রেন্ডের শেষে | মাঝারি রিভার্সাল |
| হারামি | ২ | ট্রেন্ডের শেষে | ট্রেন্ডের গতি কমছে |
| টুইজার টপ/বটম | ২ | সাপোর্ট বা রেজিস্ট্যান্সে | রিভার্সাল |
| মর্নিং/ইভনিং স্টার | ৩ | ট্রেন্ডের শেষে | শক্তিশালী রিভার্সাল |
| থ্রি সোলজার্স / ক্রোজ | ৩ | ট্রেন্ডের শুরুতে | জোরালো ট্রেন্ড |
| থ্রি ইনসাইড আপ/ডাউন | ৩ | ট্রেন্ডের শেষে | হারামির নিশ্চিতকরণ |
| রাইজিং/ফলিং থ্রি মেথডস | ৫ | ট্রেন্ডের মাঝে | ট্রেন্ড অব্যাহত |
তানভীর বলল, "বাপরে, এত নাম মুখস্থ করতে হবে?"
চাচা হেসে বললেন, "না, শুধু মনে রাখো, প্রতিটি প্যাটার্নের পেছনে একটি সাধারণ গল্প আছে: কে আক্রমণ করল, কে প্রতিরোধ করল, কে হারল। নাম ভুলে গেলে ক্ষতি নেই, গল্পটা পড়তে পারলেই হলো।"
অধ্যায় ৬: চার্ট প্যাটার্ন, দামের বড় আকার
"ক্যান্ডেল প্যাটার্ন হলো এক-দুই-তিন দিনের গল্প," চাচা বললেন। "এবার সপ্তাহ-মাসজুড়ে তৈরি হওয়া বড় আকারগুলো দেখো। এদের বলে চার্ট প্যাটার্ন (Chart Pattern)। এগুলো দুই ভাগে পড়ে: রিভার্সাল (ট্রেন্ড উল্টে যাওয়ার) আর কন্টিনিউয়েশন (ট্রেন্ড চালিয়ে যাওয়ার)।"
রিভার্সাল প্যাটার্ন
হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স ও তার উল্টো রূপ
আপট্রেনের শেষে তিনটি চূড়া তৈরি হয়, মাঝেরটি সবচেয়ে উঁচু (মাথা), দুপাশের দুটি কিছুটা নিচু (বাম ও ডান কাঁধ)। চূড়াগুলোর মাঝের খাদ দুটি জুড়ে যে রেখা, তার নাম নেকলাইন (Neckline)। দাম নেকলাইনের নিচে নামলে প্যাটার্ন সম্পূর্ণ, নিম্নগতির সংকেত।
ইনভার্স হেড অ্যান্ড শোল্ডার্স ডাউনট্রেনের শেষে একই প্যাটার্ন উল্টো ছবিতে। নেকলাইন ভেদ করে ওপরে উঠলে ঊর্ধ্বগতির সংকেত।
প্রচলিত লক্ষ্যমাত্রা (Price Target) হিসাবের নিয়ম: মাথা থেকে নেকলাইন পর্যন্ত যতটা উচ্চতা, ভাঙার পর দাম নেকলাইন থেকে তত দূর যেতে পারে।
ডাবল টপ ও ডাবল বটম
- ডাবল টপ (Double Top, ইংরেজি 'M' আকৃতি): দাম দুবার একই রেজিস্ট্যান্সে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে। মাঝের খাদ ভাঙলে পতন।
- ডাবল বটম (Double Bottom, 'W' আকৃতি): দাম দুবার একই সাপোর্ট থেকে ফিরে আসে। মাঝের চূড়া ভেদ করলে ঊর্ধ্বগতি।
আরও শক্তিশালী রূপ হলো ট্রিপল টপ (Triple Top) ও ট্রিপল বটম (Triple Bottom)। একই স্তর তিনবার পরীক্ষা হয়, আর স্তরটি তিনবারই টিকে থাকে।
রাউন্ডিং বটম ও রাউন্ডিং টপ
ধীরে ধীরে গোল পেয়ালার মতো নেমে আবার ওঠা। বিক্রেতার শক্তি আস্তে আস্তে ফুরিয়ে ক্রেতাদের হাতে চলে আসছে। ধীর, কিন্তু টেকসই রিভার্সাল। উল্টো রূপ রাউন্ডিং টপ।
কন্টিনিউয়েশন প্যাটার্ন
ট্রায়াঙ্গল, ত্রিভুজ
দামের ওঠানামা ক্রমে ছোট হয়ে সংকুচিত হয়, যেন কোনো স্প্রিং চাপা পড়ছে। শেষে তা ফেটে একদিকে ছোটে।
- অ্যাসেন্ডিং ট্রায়াঙ্গল (Ascending Triangle): ছাদ সমান, মেঝে ক্রমে উঠছে। ক্রেতারা বারবার আরও উঁচু দামে কিনছে, তাই সাধারণত ওপরে ব্রেকআউট।
- ডিসেন্ডিং ট্রায়াঙ্গল (Descending Triangle): মেঝে সমান, ছাদ ক্রমে নামছে। সাধারণত নিচে ব্রেকডাউন।
- সিমেট্রিক্যাল ট্রায়াঙ্গল (Symmetrical Triangle): ছাদ নামছে, মেঝে উঠছে, দুটিই কাছে আসছে। আগের ট্রেন্ডের দিকে ভাঙার সম্ভাবনা বেশি, কিন্তু নিশ্চিত নয়।
ফ্ল্যাগ ও পেনান্ট
হঠাৎ তীক্ষ্ণ ওঠার (বা নামার) পর অল্প সময়ের বিরতি, তারপর আবার একই দিকে যাত্রা। তীক্ষ্ণ অংশকে বলে খুঁটি (Flagpole), বিরতির অংশ ফ্ল্যাগ (সমান্তরাল রেখার মধ্যে সামান্য উল্টো ঢালু) অথবা পেনান্ট (ছোট ত্রিভুজাকার)। খুঁটির সমান দূরত্ব ভাঙার পর আবার যাওয়ার প্রবণতা থাকে।
ওয়েজ, কীলক
দুটি রেখা একই দিকে ঢালু হয়ে কাছাকাছি আসে। রাইজিং ওয়েজ (Rising Wedge) দাম বাড়ার মধ্যেও ওঠানামার সীমা সংকুচিত, সাধারণত বেয়ারিশ। ফলিং ওয়েজ (Falling Wedge) দাম কমার মধ্যে ওঠানামা সংকুচিত, সাধারণত বুলিশ।
কাপ অ্যান্ড হ্যান্ডেল
একটি গোল পেয়ালার মতো নেমে ওঠা (কাপ), তারপর ডান দিকে ছোট একটি নেমে আসা (হাতল), তারপর আগের চূড়া ভেদ করে ব্রেকআউট। দীর্ঘমেয়াদি বুলিশ প্যাটার্ন হিসেবে জনপ্রিয়।
আয়তক্ষেত্র বা রেক্ট্যাঙ্গল
দাম একটি সমান্তরাল সীমার মধ্যে আটকে থাকে (সমান ছাদ ও মেঝে)। যেদিকেই ভাঙুক, সেদিকে নতুন ট্রেন্ড শুরু হতে পারে।
প্যাটার্ন বিশ্বাস করার আগে তিনটি প্রশ্ন: ১) প্যাটার্ন কি সত্যিই পরিষ্কার, নাকি আমি জোর করে দেখছি? ২) ভাঙার সময় ভলিউম কি বেড়েছে? ৩) বড় টাইমফ্রেমের ট্রেন্ড কি একই দিকে?
অধ্যায় ৭: টেকনিক্যাল ইন্ডিকেটর, চার্টের যন্ত্রপাতি
তানভীর বলল, "চাচা, এসব আকার আমার চোখে আসছে না। আমি কি যন্ত্রের সাহায্য নিতে পারি?"
"অবশ্যই। এ যন্ত্রগুলোর নাম ইন্ডিকেটর (Indicator)। দাম আর ভলিউমের ওপর গাণিতিক সূত্র চালিয়ে বানানো রেখা বা দণ্ড, যা ট্রেন্ড, গতি আর ঝুঁকি মাপে। কিন্তু একটি সতর্কতা আগেই দিই:"
কোনো ইন্ডিকেটর ভবিষ্যৎ বলে না। বেশিরভাগ ইন্ডিকেটর অতীতের দামের হিসাব, তাই এরা পিছিয়ে চলে (ল্যাগিং ইন্ডিকেটর, Lagging)। কিছু ইন্ডিকেটর আগাম ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টা করে (লিডিং ইন্ডিকেটর, Leading), কিন্তু তখন ভুল সংকেতও বেশি আসে। এ ছাড়া যেকোনো ইন্ডিকেটরই ফলস সিগন্যাল (False Signal) বা ভুল সংকেত দিতে পারে।
ইন্ডিকেটরকে চারটি পরিবারে ভাগ করা যায়: ট্রেন্ড, মোমেন্টাম, ভোলাটিলিটি ও ভলিউম।
পরিবার ১: ট্রেন্ড ইন্ডিকেটর, বাজার কোন দিকে যাচ্ছে?
মুভিং অ্যাভারেজ (MA)
নির্দিষ্ট কয়েক দিনের ক্লোজিং দামের গড়, যা প্রতিদিন এক ঘর সরে সরে একটি মসৃণ রেখা বানায়। দামের এলোমেলো কাঁপুনি কমিয়ে আসল দিকটা দেখায়।
- সিম্পল মুভিং অ্যাভারেজ (SMA): সাধারণ গড়। গত ২০ দিনের SMA মানে গত ২০ দিনের ক্লোজের গড়।
- এক্সপোনেনশিয়াল মুভিং অ্যাভারেজ (EMA): সাম্প্রতিক দামকে বেশি ওজন দেয়, ফলে দ্রুত সাড়া দেয়।
- WMA (Weighted MA) আরেক ধরন, যেখানে ওজন ক্রমান্বয়ে বদলায়।
জনপ্রিয় মেয়াদ: ছোট মেয়াদে ৯, ২০ বা ২১; মাঝারি ৫০; দীর্ঘ ১০০ ও ২০০। দাম ২০০ দিনের MA-এর ওপরে থাকলে বাজার সাধারণত বুলিশ বলে ধরা হয়। MA নিজেই গতিশীল সাপোর্ট বা রেজিস্ট্যান্স হিসেবেও কাজ করে।
গোল্ডেন ক্রস ও ডেথ ক্রস: ছোট মেয়াদের MA (যেমন ৫০) যখন বড় মেয়াদের MA-কে (যেমন ২০০) নিচ থেকে কেটে ওপরে ওঠে, তাকে গোল্ডেন ক্রস (Golden Cross) বলে, বুলিশ সংকেত। উল্টোটা, ওপর থেকে নিচে কাটলে ডেথ ক্রস (Death Cross), বেয়ারিশ।
MACD, মুভিং অ্যাভারেজ কনভারজেন্স ডাইভারজেন্স
এটি দুটি EMA-র (সাধারণত ১২ ও ২৬) পার্থক্য থেকে বানানো। এর তিনটি অংশ:
- MACD লাইন: ১২ দিনের EMA − ২৬ দিনের EMA
- সিগন্যাল লাইন: MACD-র ৯ দিনের EMA
- হিস্টোগ্রাম: MACD আর সিগন্যাল লাইনের মধ্যের ব্যবধান, দণ্ড হিসেবে আঁকা
MACD লাইন সিগন্যাল লাইনকে নিচ থেকে কেটে ওপরে উঠলে বুলিশ ক্রসওভার (কেনার ইঙ্গিত), ওপর থেকে নিচে কাটলে বেয়ারিশ ক্রসওভার (বেচার ইঙ্গিত)। MACD শূন্য রেখার ওপরে মানে সামগ্রিক ঊর্ধ্বমুখী ঝোঁক। হিস্টোগ্রাম ছোট হতে থাকলে গতি কমছে।
ADX ও DMI, ট্রেন্ড কতটা শক্তিশালী?
ADX (Average Directional Index) ট্রেন্ডের দিক নয়, শক্তি মাপে (০ থেকে ১০০)। ২৫-এর ওপরে মানে জোরালো ট্রেন্ড, ২০-এর নিচে মানে ট্রেন্ড নেই, বাজার সাইডওয়েজ। দিক বলে +DI ও −DI (Directional Movement Index)। ADX কম থাকলে MA ক্রসওভারের ওপর ভরসা কম।
আরও কিছু ট্রেন্ড-সহায়ক
- প্যারাবোলিক এসএআর (Parabolic SAR): দামের ওপরে বা নিচে বিন্দুর সারি। বিন্দু নিচে থাকলে আপট্রেন, ওপরে এলে ট্রেন্ড উল্টে গেছে বলে ধরা হয়। স্টপ-লস টেনে নেওয়ার জন্য কাজের।
- সুপারট্রেন্ড (Supertrend): ATR-এর সঙ্গে হিসাব করা একটি রেখা, যা দামের নিচে (সবুজ) বা ওপরে (লাল) এসে ট্রেন্ডের দিক জানায়।
- ইচিমোকু ক্লাউড (Ichimoku Cloud): একসঙ্গে সাপোর্ট, রেজিস্ট্যান্স, ট্রেন্ড ও গতি দেখানো এক জাপানি ব্যবস্থা। দাম মেঘের ওপরে থাকলে বুলিশ, নিচে বেয়ারিশ, ভেতরে অনিশ্চিত।
পরিবার ২: মোমেন্টাম ইন্ডিকেটর, দামের গতি কেমন?
মোমেন্টাম মানে দাম যে গতিতে ছুটছে সেই গতি। গাড়ি যত জোরে ছোটে, ব্রেক কষতে তত সময় লাগে, আবার ইঞ্জিন গরম হয়ে আসাও বোঝা যায়।
RSI, রিলেটিভ স্ট্রেংথ ইনডেক্স
গত সাধারণত ১৪ দিনে দাম কতটা বেড়েছে বনাম কতটা কমেছে, তার তুলনা, ০ থেকে ১০০ স্কেলে।
- ৭০-এর ওপরে: ওভারবট (Overbought, অতিরিক্ত কেনা)। দাম বেশি ওপরে উঠে গেছে, সংশোধন আসতে পারে।
- ৩০-এর নিচে: ওভারসোল্ড (Oversold, অতিরিক্ত বেচা)। দাম বেশি নেমে গেছে, ফিরে আসতে পারে।
- ৫০: ভারসাম্যরেখা। ৫০-এর ওপরে বুলিশ, নিচে বেয়ারিশ।
ভুল ধারণা সংশোধন: RSI ৭০ ছাড়ালেই বেচে দেওয়া বা ৩০ ছোঁয়ার সঙ্গে কিনে ফেলা ভুল। শক্তিশালী আপট্রেনে RSI মাসের পর মাস ৭০-এর ওপরে থাকতে পারে। ওভারবট মানে "এখনই নামবে" নয়, মানে "সতর্ক হও"।
ডাইভারজেন্স, সবচেয়ে মূল্যবান সংকেতগুলোর একটি
ডাইভারজেন্স (Divergence) হলো দাম আর ইন্ডিকেটর উল্টো দিকে যাওয়া।
- বেয়ারিশ ডাইভারজেন্স: দাম নতুন উঁচু হাই বানাচ্ছে, কিন্তু RSI (বা MACD) নিচু হাই বানাচ্ছে। চালটা দুর্বল হয়ে আসছে, পতনের আগাম আভাস।
- বুলিশ ডাইভারজেন্স: দাম নতুন নিচু লো বানাচ্ছে, কিন্তু RSI উঁচু লো বানাচ্ছে। বিক্রয়চাপ কমছে, ওঠার আভাস।
স্টোকাস্টিক অসিলেটর
বর্তমান ক্লোজ গত কয়েক দিনের হাই-লো পরিসরের কোথায় আছে তা মাপে (০ থেকে ১০০)। ৮০-এর ওপরে ওভারবট, ২০-এর নিচে ওভারসোল্ড। এতে দুটি রেখা থাকে, %K (দ্রুত) ও %D (ধীর)। %K, %D-কে কাটলে সংকেত।
অন্যান্য মোমেন্টাম ইন্ডিকেটর
- CCI (Commodity Channel Index): দাম তার গড় থেকে কতটা সরে গেছে। +১০০-এর ওপরে শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি, −১০০-এর নিচে শক্তিশালী নিম্নগতি।
- উইলিয়ামস %R (Williams %R): স্টোকাস্টিকের মতোই, কিন্তু স্কেল ০ থেকে −১০০।
- ROC (Rate of Change): নির্দিষ্ট দিন আগের তুলনায় দাম কত শতাংশ বদলেছে।
পরিবার ৩: ভোলাটিলিটি ইন্ডিকেটর, দামের দোলাচল কতটা?
ভোলাটিলিটি (Volatility) মানে দামের ওঠানামার মাত্রা। বেশি ভোলাটিলিটিতে সুযোগও বেশি, ঝুঁকিও বেশি।
বলিঙ্গার ব্যান্ড
একটি ২০ দিনের SMA-কে মাঝখানে রেখে তার দুই পাশে দুটি ব্যান্ড, যাদের দূরত্ব স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের (Standard Deviation, গড় থেকে ছড়ানোর পরিমাপ) দুই গুণ। দাম সাধারণত ব্যান্ডের ভেতরেই থাকে।
- ব্যান্ড সরু হলে (স্কুইজ, Squeeze) বাজার শান্ত, এরপর প্রায়ই বড় চাল আসে। দিক কোনটা তা বলে না।
- দাম ওপরের ব্যান্ড ছুঁলে তুলনামূলক ওপরে, নিচের ব্যান্ড ছুঁলে তুলনামূলক নিচে। কিন্তু শক্তিশালী ট্রেন্ডে দাম ব্যান্ড ধরে ধরে চলতে পারে।
ATR, অ্যাভারেজ ট্রু রেঞ্জ
গত ১৪ দিনে দাম গড়ে কতটা ওঠানামা করেছে তার মাপ, টাকায়। এ দিয়ে স্টপ-লস কত দূরে রাখব তা ঠিক করা যায়। যেমন, ATR ২ টাকা হলে স্টপ-লস প্রবেশমূল্যের ২ থেকে ৩ টাকা নিচে রাখা যুক্তিসংগত, কারণ স্বাভাবিক ওঠানামা এর ভেতরেই ঘটে।
আরও দুটি
- স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন নিজেও ভোলাটিলিটির সরাসরি মাপ।
- কেল্টনার চ্যানেল (Keltner Channel) বলিঙ্গারের মতোই, কিন্তু ATR দিয়ে বানানো।
পরিবার ৪: ভলিউমভিত্তিক ইন্ডিকেটর, টাকা কোন দিকে যাচ্ছে?
- OBV (On-Balance Volume): দাম বাড়লে সেদিনের ভলিউম যোগ, কমলে বিয়োগ করে একটি ধারাবাহিক রেখা। দাম সমতল অথচ OBV বাড়ছে মানে চুপিচুপি কেনা চলছে।
- VWAP (Volume Weighted Average Price): ভলিউম হিসাব করে দিনের গড় দাম। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এটিকে মানদণ্ড ধরে। বর্তমান দাম VWAP-এর ওপরে থাকলে ওই দিন ক্রেতারা এগিয়ে।
- MFI (Money Flow Index): দাম ও ভলিউম মিলিয়ে বানানো RSI-এর মতো ইন্ডিকেটর, কিন্তু ভলিউমসহ। ৮০ ওভারবট, ২০ ওভারসোল্ড।
- A/D লাইন (Accumulation/Distribution): ক্যান্ডেলের ক্লোজ তার রেঞ্জের কোথায় তা দেখে অনুমান করে বড়রা জমাচ্ছে (অ্যাকিউমুলেশন) না ছাড়ছে (ডিস্ট্রিবিউশন)।
সূক্ষ্ম মাত্রা: ফিবোনাচ্চি ও পিভট পয়েন্ট
ফিবোনাচ্চি রিট্রেসমেন্ট
দাম বড় ওঠার পর কিছুটা নেমে আসে, এই নামাকে রিট্রেসমেন্ট (Retracement) বলে। কতটা নামবে তার সম্ভাব্য ধাপ ধরা হয় ফিবোনাচ্চি সংখ্যা থেকে বানানো শতাংশে: ২৩.৬%, ৩৮.২%, ৫০%, ৬১.৮%, ৭৮.৬%। তুমি সুইং লো থেকে সুইং হাই পর্যন্ত টেনে দিলেই সফটওয়্যার এই সারি এঁকে দেবে। ৩৮.২% থেকে ৬১.৮% এর এলাকাকে ট্রেন্ডে ঢোকার ভালো জায়গা ধরা হয়।
পিভট পয়েন্ট
আগের দিনের হাই, লো ও ক্লোজ থেকে হিসাব করা সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স স্তর (পিভট, S1, S2, R1, R2)। ছোট টাইমফ্রেমের ট্রেডাররা দিনের সম্ভাব্য সীমা অনুমানে ব্যবহার করে।
এ ছাড়া এলিয়ট ওয়েভ (Elliott Wave) ও গ্যান (Gann) তত্ত্বও আছে, যেখানে দামের গতিকে নির্দিষ্ট ঢেউ ও কোণের ছকে ফেলা হয়। এগুলো উন্নত, আর নতুনদের জন্য এ মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয়।
ইন্ডিকেটরের চিটশিট
| ইন্ডিকেটর | কী মাপে | কেনার ইঙ্গিত | বেচার ইঙ্গিত |
|---|---|---|---|
| মুভিং অ্যাভারেজ | ট্রেন্ডের দিক | দাম MA-এর ওপরে, গোল্ডেন ক্রস | দাম MA-এর নিচে, ডেথ ক্রস |
| MACD | ট্রেন্ড ও গতি | MACD সিগন্যালকে ওপরে কাটে | MACD সিগন্যালকে নিচে কাটে |
| ADX | ট্রেন্ডের শক্তি | ২৫-এর ওপরে ও +DI ওপরে | ২৫-এর ওপরে ও −DI ওপরে |
| RSI | গতি, অতি-কেনা/বেচা | ৩০-এর নিচ থেকে উঠে আসা | ৭০-এর ওপর থেকে নেমে আসা |
| স্টোকাস্টিক | দাম পরিসরের কোথায় | ২০-এর নিচে %K ওপরে কাটে | ৮০-এর ওপরে %K নিচে কাটে |
| বলিঙ্গার ব্যান্ড | ভোলাটিলিটি | স্কুইজের পর ওপরে ব্রেকআউট | স্কুইজের পর নিচে ব্রেকডাউন |
| ATR | দৈনিক দোলাচল | (দিক বলে না) স্টপ-লস মাপতে | (দিক বলে না) পজিশন সাইজ ঠিক করতে |
| OBV / MFI | টাকার প্রবাহ | দামের আগে OBV বাড়ে | দাম বাড়ে কিন্তু OBV কমে |
অধ্যায় ৮: সিগন্যাল, সবকিছু মিলিয়ে সিদ্ধান্ত
"এত যন্ত্র দিয়ে কী করব?" তানভীর বলল। "একটা বলছে কেনো, আরেকটা বলছে বেচো।"
মিজান চাচা গম্ভীর হলেন। "এখানেই নতুনরা মার খায়। একটি ইন্ডিকেটর দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া মানে একজন সাক্ষীর কথায় রায় দেওয়া। যত বেশি সাক্ষী এক কথা বলে, রায় তত শক্ত।"
এ ধারণার নাম কনফ্লুয়েন্স (Confluence), মানে একাধিক আলাদা সংকেতের একই জায়গায় মিলে যাওয়া। যেমন:
- দাম একটি শক্তিশালী সাপোর্টে এসে ঠেকেছে (চার্টের গঠন)
- সেখানে একটি বুলিশ এনগালফিং তৈরি হয়েছে (ক্যান্ডেল প্যাটার্ন)
- RSI ৩০ ছুঁয়ে ফিরেছে এবং বুলিশ ডাইভারজেন্স দেখাচ্ছে (মোমেন্টাম)
- ওই ক্যান্ডেলের ভলিউম আগের গড়ের দ্বিগুণ (ভলিউম)
- সাপ্তাহিক চার্টে বড় ট্রেন্ড ঊর্ধ্বমুখী (মাল্টি-টাইমফ্রেম)
এমন পাঁচ সাক্ষীর একই কথা হলে সংকেত অনেক শক্তিশালী। এই পদ্ধতি মাল্টি-টাইমফ্রেম অ্যানালাইসিস (Multi-Timeframe Analysis) নামেও পরিচিত: বড় টাইমফ্রেমে দিক ঠিক করো, ছোট টাইমফ্রেমে ঢোকার জায়গা খোঁজো।
সংকেতের কয়েকটি শব্দ
- এন্ট্রি (Entry): কেনার বা পজিশনে ঢোকার জায়গা।
- এক্সিট (Exit): বেরিয়ে আসার জায়গা। লাভে বেরোলে টার্গেট (Target), লোকসানে বেরোলে স্টপ-লস।
- লং পজিশন (Long): দাম বাড়বে এই আশায় কেনা। (শর্ট বা শর্ট-সেলিং মানে ধার করে বেচে পরে কম দামে কিনে ফেরত দেওয়া, যা সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীর জন্য আমাদের বাজারে সীমিত।)
- লাভ বুক করা (Profit Booking): লাভের অবস্থায় বেচে দিয়ে লাভ পকেটে তোলা।
- ট্রেইলিং স্টপ (Trailing Stop): দাম ওপরে উঠলে স্টপ-লসও ধাপে ধাপে ওপরে তোলা, যাতে লাভ সুরক্ষিত থাকে।
- বুলট্র্যাপ (Bull Trap) ও বেয়ার ট্র্যাপ (Bear Trap): ব্রেকআউট বা ব্রেকডাউনের ভান করে দাম উল্টে গিয়ে অতি-আগ্রহীদের ফাঁদে ফেলা।
- ব্যাকটেস্টিং (Backtesting): নিজের নিয়ম অতীতের চার্টে চালিয়ে দেখা কেমন ফল হতো।
অধ্যায় ৯: ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, টিকে থাকার বিদ্যা
চাচা এবার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টি খুললেন। "ভালো ট্রেডার আর খারাপ ট্রেডারের মধ্যে বড় পার্থক্য সংকেত বাছাইয়ে নয়, ঝুঁকি সামলানোয়। শেয়ারবাজারে প্রথম নিয়ম হলো মূলধন বাঁচানো, দ্বিতীয় নিয়ম হলো প্রথম নিয়মটি ভুলে না যাওয়া।"
স্টপ-লস, আগে থেকে বলে রাখো কতটুকু লোকসান সইবে
স্টপ-লস (Stop Loss) হলো সেই দাম যেখানে এসে তুমি ভুল স্বীকার করে বেরিয়ে যাবে। ঢোকার আগেই ঠিক করে রাখবে, ঢোকার পর আবেগের ঘোরে নয়। সাধারণত স্টপ-লস রাখা হয় সাপোর্টের সামান্য নিচে, বা ATR-এর কয়েক গুণ দূরে। (আমাদের বাজারে স্বয়ংক্রিয় স্টপ-লস অর্ডারের সুবিধা সাধারণত প্রচলিত নয়, ফলে নিজেকে শৃঙ্খলা মানতে হয়। তোমার ব্রোকারের সুবিধা কী আছে জেনে নিও।)
রিস্ক-রিওয়ার্ড অনুপাত
রিস্ক-রিওয়ার্ড রেশিও (Risk-Reward Ratio): যতটা ঝুঁকি নিচ্ছ, তার তুলনায় কতটা লাভের সম্ভাবনা। ৪ টাকা ঝুঁকি নিয়ে ৮ টাকা লাভের লক্ষ্য রাখলে অনুপাত ১:২। অনুপাত ১:২ বা তার বেশি হলে চার বারের মধ্যে মাত্র দুইবার সফল হলেও তুমি লাভে থাকবে। এটাকেই বলে এক্সপেক্টেন্সি (Expectancy), অর্থাৎ ঘুরে-ফিরে গড়ে লাভ হবে কি না।
পজিশন সাইজিং, কত টাকা ঢালব?
মোটা নিয়ম: একটি ট্রেডে মোট মূলধনের ১ থেকে ২ শতাংশের বেশি ঝুঁকিতে ফেলো না। সূত্র:
শেয়ার সংখ্যা = (মূলধন × ঝুঁকির %) ÷ (এন্ট্রি দাম − স্টপ-লস দাম)
ডাইভার্সিফিকেশন, সব ডিম এক ঝুড়িতে নয়
ডাইভার্সিফিকেশন (Diversification) মানে টাকা একাধিক শেয়ার ও একাধিক শিল্পখাতে ছড়িয়ে রাখা। একই খাতের পাঁচটি শেয়ার আসলে একটিই বাজি, কারণ খাত খারাপ হলে সবগুলো একসঙ্গে পড়ে। এ জন্য কোম্পানির পাশাপাশি সম্পর্ক (Correlation) দেখো: দুটি শেয়ার কি প্রায় একই সঙ্গে ওঠানামা করে?
আরও কিছু ঝুঁকি-সংক্রান্ত শব্দ: ড্রডাউন (Drawdown) হলো সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে পোর্টফোলিওর সর্বোচ্চ পতন। ১০% ড্রডাউন ফিরিয়ে আনতে লাগে ১১.১% লাভ, আর ৫০% ড্রডাউন পূরণ করতে লাগে ১০০% লাভ। লিভারেজ (Leverage) বা মার্জিন ঋণ (Margin Loan) হলো ধার করা টাকায় কেনা, যা লাভ ও লোকসান দুটিকেই বহুগুণ করে। নতুনদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরামর্শ: ধার করা টাকায় শেয়ার নয়। তারল্য ঝুঁকি (Liquidity Risk) মানে এত কম লেনদেনের শেয়ার কিনে ফেলা যে বেচতে চাইলে ক্রেতা পাওয়া যায় না।
বিনিয়োগকারী না ট্রেডার?
- ট্রেডিং (Trading): স্বল্প সময়ে (দিন থেকে সপ্তাহ বা কয়েক মাস) দামের ওঠানামা থেকে লাভ। বেশি সময়, বেশি মনোযোগ ও কঠোর শৃঙ্খলা লাগে। আমাদের বাজারে কেনা শেয়ার সেটলমেন্টের আগে সাধারণত বেচা যায় না, তাই ইন্ট্রাডে-জাতীয় কৌশলের সুযোগ সীমিত। বর্তমান নিয়ম জেনে নিও।
- ইনভেস্টিং (Investing): ভালো কোম্পানিতে বছরের পর বছর থাকা, লভ্যাংশ ও প্রবৃদ্ধির ফল পাওয়া। বাই অ্যান্ড হোল্ড (Buy and Hold) এর পথ।
- ডলার-কস্ট অ্যাভারেজিং (Dollar-Cost Averaging) বা এসআইপি (SIP, Systematic Investment Plan) হলো প্রতি মাসে একটি নির্দিষ্ট অঙ্ক বিনিয়োগ করা। দাম কম থাকলে বেশি শেয়ার, বেশি থাকলে কম শেয়ার, ফলে গড় খরচ সমান হয়ে আসে, আর "সঠিক সময়" খোঁজার চাপ কমে।
- সুইং ট্রেডিং (Swing Trading): কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহের একেকটি ঢেউ ধরার চেষ্টা, ট্রেডিং ও ইনভেস্টিংয়ের মাঝামাঝি।
মনস্তত্ত্ব, সবচেয়ে বড় শত্রু আপনি নিজে
চাচা বললেন, "পনেরো বছরে আমি দেখেছি, মানুষ যত না চার্টে হারে, তার চেয়ে বেশি হারে নিজের মনের কাছে।" শেয়ারবাজারের চেনা মানসিক ফাঁদগুলো:
- ফোমো (FOMO, Fear Of Missing Out): সবাই লাভ করছে দেখে দাম আকাশে ওঠার পরে লাফিয়ে ঢোকা।
- লোভ ও ভয় (Greed and Fear): লোভে লাভের অবস্থায় বেশিক্ষণ থাকা, আর ভয়ে সামান্য পতনে সব বেচে দেওয়া।
- ঝাঁকের মানসিকতা (Herd Mentality): ভিড়ের সঙ্গে চলা, নিজে না বুঝে।
- লস অ্যাভার্শন (Loss Aversion): লাভের আনন্দের চেয়ে লোকসানের কষ্ট বেশি লাগে বলে হারা শেয়ার আঁকড়ে রাখা ("দাম ফিরলেই বেচব")।
- কনফার্মেশন বায়াস (Confirmation Bias): নিজের পক্ষের খবর খোঁজা, বিপক্ষের খবর এড়ানো।
- অ্যাঙ্কারিং (Anchoring): নিজের কেনা দামকে বাজারের সত্য ধরে নেওয়া।
- ওভারকনফিডেন্স (Overconfidence): কয়েকটি সফল ট্রেডের পর নিজেকে অপরাজেয় ভাবা।
- অ্যাভারেজিং ডাউন (Averaging Down): হারা শেয়ার আরও কিনে গড় দাম কমানোর চেষ্টা। যুক্তি থাকলে ঠিক, কিন্তু অনেকে এতে ভুল সিদ্ধান্তের ওপর আরও টাকা ঢেলে বসে।
- রিভেঞ্জ ট্রেডিং (Revenge Trading): লোকসান ফেরত পেতে রাগের মাথায় ঝুঁকিপূর্ণ ট্রেডে ঢোকা।
- সানক কস্ট ফ্যালাসি (Sunk Cost Fallacy): "এত টাকা ঢেলেছি, এখন বেরোব কীভাবে" ভেবে খারাপ অবস্থানে থেকে যাওয়া।
এসব এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো ট্রেডিং জার্নাল (Trading Journal)। প্রতিটি ট্রেডের আগে-পরে লিখে রাখো: কেন ঢুকলাম, স্টপ-লস কোথায়, টার্গেট কত, ফল কী হলো, আর কী শিখলাম। এক-দুই মাস পর জার্নাল তোমাকে তোমার নিজের ভুলের প্যাটার্নটা দেখিয়ে দেবে।
আর শেয়ারবাজারে গুজব (Rumor) আর টিপস (Tips) থেকে সাবধান। "অমুক শেয়ার কাল দ্বিগুণ হবে" ধরনের কথা শুনে কেনা মানে অন্যের তৈরি ফাঁদে পা দেওয়া। বিশেষত পাম্প অ্যান্ড ডাম্প (Pump and Dump) নামের কারসাজিতে একদল অল্প দামে কিনে গুজব ছড়িয়ে দাম চড়ায়, তারপর সাধারণ মানুষের কাছে বেচে বেরিয়ে যায়। আর যারা শেষে ঢোকে, তারা ডুবে।
অধ্যায় ১০: পুরো গল্প একসঙ্গে, তানভীরের প্রথম সিদ্ধান্ত
শনিবার সকালে তানভীর বসল নিজের খাতা নিয়ে। সে ফান্ডামেন্টাল ও টেকনিক্যাল দুটোই মেলাবে। কাল্পনিক আলফা টেক্সটাইল লিমিটেড-এর ওপর ধাপে ধাপে কাজ করল।
ধাপ ১: ফান্ডামেন্টাল ছাঁকনি।
- ইপিএস ৩.০০ টাকা, গত বছরের তুলনায় ১৫% বৃদ্ধি ✓
- পি/ই ১৫, খাতের গড় ১৮-এর চেয়ে কম ✓
- পি/বি ১.১৮, NAV-এর কাছাকাছি ✓
- ঋণ-ইক্যুইটি ০.৪৯, চলতি অনুপাত ১.৬ ✓
- সুদ কাভারেজ ৪ গুণ ✓
- ডিভিডেন্ড ইয়িল্ড ৩.৩%, পেআউট ৫০% ✓
- নিরীক্ষকের পরিষ্কার মত, ক্যাটাগরি A ✓
- ন্যায্য মূল্য ৫৪ টাকা, নিরাপত্তার ব্যবধানসহ কেনার আদর্শ দাম ৪৩ টাকা ⚠️
কোম্পানি ভালো, কিন্তু বর্তমান বাজারদর ৪৫ টাকা, আদর্শ দামের চেয়ে একটু ওপরে। তানভীর ধৈর্য ধরল।
ধাপ ২: টেকনিক্যাল সময়-নির্বাচন।
দৈনিক ও সাপ্তাহিক চার্ট খুলল। দেখল:
- সাপ্তাহিক চার্টে আপট্রেন চলছে, দাম ২০০ দিনের MA-এর ওপরে।
- দাম গত কয়েক মাস ৪২ থেকে ৫২ টাকার রেঞ্জে ঘুরছে। সাপোর্ট ৪২, রেজিস্ট্যান্স ৫২।
- দুই সপ্তাহ পর দাম ৪২ টাকার সাপোর্টের কাছে নেমে এল। একদিন একটি হ্যামার তৈরি হলো। পরদিন বুলিশ এনগালফিং, আর সেদিনের ভলিউম আগের গড়ের দ্বিগুণ।
- RSI ৩২ ছুঁয়ে ফিরে এসেছে, আগের লোর তুলনায় বুলিশ ডাইভারজেন্স।
- MACD লাইন সিগন্যাল লাইনকে নিচ থেকে কেটে ওপরে উঠেছে।
পাঁচটি আলাদা সাক্ষী একই কথা বলছে। এবং দাম এখন ফান্ডামেন্টাল-সম্মত আদর্শ দামের (৪৩ টাকা) কাছেই।
ধাপ ৩: ঝুঁকির হিসাব।
| বিষয় | মান |
|---|---|
| মোট মূলধন | ৫,০০,০০০ টাকা |
| ঝুঁকির সীমা (২%) | ১০,০০০ টাকা |
| এন্ট্রি দাম | ৪৩ টাকা |
| স্টপ-লস (সাপোর্টের সামান্য নিচে) | ৩৯ টাকা |
| প্রতি শেয়ারে ঝুঁকি | ৪ টাকা |
| টার্গেট (পরবর্তী রেজিস্ট্যান্সের কাছে) | ৫১ টাকা |
| প্রতি শেয়ারে সম্ভাব্য লাভ | ৮ টাকা |
| রিস্ক-রিওয়ার্ড | ১:২ |
| শেয়ার সংখ্যা | ১০,০০০ ÷ ৪ = ২,৫০০ |
| মোট বিনিয়োগ | ২,৫০০ × ৪৩ = ১,০৭,৫০০ টাকা (মূলধনের ২১.৫%) |
খেয়াল করো, ভুল হলে তানভীরের লোকসান সর্বোচ্চ ১০,০০০ টাকা, মূলধনের মাত্র ২%। আর সব ঠিক চললে লাভ ২০,০০০ টাকা। বাকি মূলধন সে অন্য খাতের ভিন্ন শেয়ারে ছড়াবে, আর মাসিক SIP-ও চালু রাখবে।
তানভীর সব লিখে জার্নালে রাখল। কেনার পর স্টপ-লস মনে রাখল, আবেগে সরাল না। দাম ৪৭ ছুঁলে সে স্টপ-লস ৪৩-এ (এন্ট্রির সমান) তুলে এনে ঝুঁকিহীন অবস্থায় এল, একে বলে ব্রেক-ইভেন স্টপ (Break-even Stop)। শেষ পর্যন্ত যা-ই হোক, সে জানল, কেন ঢুকেছে, কখন বেরোবে।
মিজান চাচা বললেন, "এবার তুমি বাজারের নতুন সদস্য নও। তুমি পরিকল্পনা নিয়ে ঢুকছ। জিতবে কি না জানি না, কিন্তু বিপর্যয় থেকে বেঁচে থাকার ব্যবস্থা তুমি করে নিয়েছ। আর বাজারে বেঁচে থাকাটাই আসল জয়।"
নতুন বিনিয়োগকারীর জন্য ১২ দফা নিয়ম
১. আগে শেখো, পরে ঢালো। প্রথম মাসগুলো পেপার ট্রেডিং (কাল্পনিক টাকায় অনুশীলন) বা খুব ছোট অঙ্কে চলুক। ২. শুধু সেই টাকা ঢালো, যা হারালে সংসার বিপন্ন হয় না। ৩. ধার করে শেয়ার কিনো না। ৪. ফান্ডামেন্টাল দিয়ে "কী" বাছো, টেকনিক্যাল দিয়ে "কখন" ঠিক করো। ৫. কেনার আগেই স্টপ-লস ঠিক করো। ৬. রিস্ক-রিওয়ার্ড অন্তত ১:২ না হলে ট্রেড নিও না। ৭. এক ট্রেডে মূলধনের ১–২%-এর বেশি ঝুঁকি নয়। ৮. একাধিক খাতে ছড়াও, কিন্তু এত কোম্পানিতে নয় যে নজর রাখা যায় না। ৯. একটি ইন্ডিকেটরের ভরসায় নয়, কনফ্লুয়েন্স খোঁজো। ১০. গুজব, টিপস ও ক্যাটাগরি Z থেকে দূরে থাকো। ১১. ট্রেডিং জার্নাল রাখো। ১২. ধৈর্য ধরো। বাজার প্রতিদিন খোলা, সুযোগও প্রতিদিন আসে। হাতছাড়া হওয়া একটি সুযোগ আরেকটির জন্ম দেয়, কিন্তু হারানো মূলধন সহজে ফেরে না।
শব্দকোষ: এক নজরে সব টার্ম
গল্প পড়তে পড়তে কোনো শব্দ ভুলে গেলে এখানে ফিরে এসো।
বাজারের মৌলিক শব্দ
| টার্ম | অর্থ |
|---|---|
| Share / Stock | কোম্পানির মালিকানার একটি অংশ |
| IPO | কোম্পানির প্রথমবার জনগণের কাছে শেয়ার ছাড়া |
| Listed | এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত |
| DSE / CSE | ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ |
| BSEC | বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন, বাজারের নিয়ন্ত্রক |
| Brokerage House | লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্রোকার, যার মাধ্যমে কেনাবেচা হয় |
| BO Account | শেয়ার রাখার ডিজিটাল অ্যাকাউন্ট |
| CDBL | শেয়ারের ডিজিটাল ডিপোজিটরি |
| Commission | ব্রোকারের সেবা-ফি |
| Face Value | শেয়ারের কাগুজে মূল্য, সাধারণত ১০ টাকা |
| Market Price | বর্তমান বাজারদর |
| Lot | নিম্নতম লেনদেনযোগ্য শেয়ার সংখ্যা |
| Bid / Ask | ক্রেতার প্রস্তাবিত দাম / বিক্রেতার চাওয়া দাম |
| Buy Order / Sell Order | কেনার / বেচার নির্দেশ |
| OHLC | Open, High, Low, Close, দিনের শুরু, সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন, শেষ দাম |
| Volume | হাতবদল হওয়া শেয়ারের সংখ্যা |
| Turnover | লেনদেনের মোট টাকার অঙ্ক |
| Circuit Breaker | একদিনে দাম ওঠানামার সর্বোচ্চ সীমা |
| Floor Price | নিয়ন্ত্রক-নির্ধারিত নিম্নতম দাম |
| Settlement (T+2) | কেনাবেচার পর শেয়ার-টাকা হস্তান্তরের সময়, সাধারণত দুই কর্মদিবস |
| Category A, B, N, Z | কোম্পানির নিয়মিততা ও লভ্যাংশ অনুযায়ী শ্রেণি |
| Index (DSEX, DS30, DSES) | বাজারের সামগ্রিক অবস্থার সূচক |
| Dividend (Cash / Stock) | লভ্যাংশ (নগদ / বোনাস শেয়ার) |
| Record Date | লভ্যাংশ পেতে শেয়ার যেদিন নামে থাকতে হবে |
| Ex-dividend | লভ্যাংশের অধিকার ছাড়া অবস্থা |
| Capital Gain / Loss | কেনা-বেচার দামের পার্থক্যে লাভ / ক্ষতি |
| Inflation | মূল্যস্ফীতি |
| Bull / Bear Market | ঊর্ধ্বমুখী / নিম্নমুখী বাজার |
ফান্ডামেন্টাল অ্যানালাইসিসের শব্দ
| টার্ম | অর্থ |
|---|---|
| Fundamental Analysis | কোম্পানির আর্থিক ও ব্যবসায়িক স্বাস্থ্য বিশ্লেষণ |
| Income Statement (P&L) | আয়-ব্যয়ের বিবরণী |
| Balance Sheet | সম্পদ, দায় ও ইক্যুইটির স্থিতিপত্র |
| Cash Flow Statement | নগদ আসা-যাওয়ার বিবরণী |
| Revenue / Sales | মোট বিক্রয় আয় |
| COGS | পণ্য তৈরির সরাসরি খরচ |
| Gross Profit | রাজস্ব − COGS |
| Operating Profit (EBIT) | পরিচালন মুনাফা, সুদ ও কর বাদের আগে |
| EBITDA | সুদ, কর, অবচয় ও পরিশোধের আগের মুনাফা |
| Net Profit | সব বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মুনাফা |
| Assets / Liabilities / Equity | সম্পদ / দায় / মালিকানা মূলধন |
| Paid-up Capital | মালিকদের দেওয়া মূল মূলধন |
| Reserve & Surplus / Retained Earnings | সঞ্চিত মুনাফা |
| Book Value | সম্পদ − দায় |
| EPS | শেয়ারপ্রতি আয় |
| P/E | দাম ÷ ইপিএস |
| NAV / NAVPS | শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য |
| P/B | দাম ÷ NAV |
| PEG | পি/ই ÷ আয় প্রবৃদ্ধি |
| EV/EBITDA | কোম্পানির মোট মূল্য (ঋণসহ) ÷ EBITDA |
| NOCFPS | শেয়ারপ্রতি পরিচালন নগদ প্রবাহ |
| ROE / ROA / ROCE | ইক্যুইটি / সম্পদ / ব্যবহৃত মূলধনের ওপর আয় |
| Gross / Operating / Net Margin | বিক্রয়ের ওপর মোট / পরিচালন / নিট মুনাফার হার |
| Revenue Growth / EPS Growth | বিক্রি / আয়ের প্রবৃদ্ধি |
| Debt-to-Equity (D/E) | ঋণ ÷ ইক্যুইটি |
| Current Ratio | চলতি সম্পদ ÷ চলতি দায় |
| Quick Ratio | মজুত পণ্য বাদে চলতি সম্পদ ÷ চলতি দায় |
| Interest Coverage | পরিচালন মুনাফা ÷ সুদ খরচ |
| Liquidity | নগদ বা নগদ-সমতুল্য সম্পদের সামর্থ্য |
| Solvency | দীর্ঘমেয়াদে সব দেনা মেটানোর সামর্থ্য |
| Dividend Yield | লভ্যাংশ ÷ বাজারদর |
| Payout Ratio | আয়ের কত অংশ লভ্যাংশ হিসেবে দেওয়া হলো |
| Market Cap | বাজারদর × মোট শেয়ার |
| Large / Mid / Small Cap | বাজার মূলধন অনুযায়ী বড় / মাঝারি / ছোট কোম্পানি |
| Free Float | সাধারণ মানুষের হাতে থাকা শেয়ার |
| Sponsor-Director Holding | উদ্যোক্তা-পরিচালকদের শেয়ার |
| Intrinsic Value | কোম্পানির নিজস্ব ন্যায্য মূল্য |
| DCF | ভবিষ্যৎ নগদ আয়ের বর্তমান মূল্য দিয়ে মূল্যায়ন |
| Margin of Safety | ন্যায্য মূল্যের চেয়ে কম দামে কেনার নিরাপত্তা-ব্যবধান |
| Qualitative / Quantitative | গুণগত / পরিমাণগত বিশ্লেষণ |
| Economic Moat | প্রতিযোগীর বিরুদ্ধে স্থায়ী সুবিধা |
| Qualified Opinion | নিরীক্ষকের আপত্তিসহ মত |
| Macroeconomics | সামষ্টিক অর্থনীতি (সুদের হার, মূল্যস্ফীতি, জিডিপি, বিনিময় হার) |
| Top-Down / Bottom-Up | অর্থনীতি থেকে কোম্পানি / কোম্পানি থেকে অর্থনীতিতে বিশ্লেষণ |
| Value / Growth Investing | সস্তা দামি কোম্পানি / দ্রুত বাড়ন্ত কোম্পানি খোঁজা |
টেকনিক্যাল অ্যানালাইসিস ও ক্যান্ডেলস্টিকের শব্দ
| টার্ম | অর্থ |
|---|---|
| Technical Analysis | দাম ও ভলিউম চার্ট দেখে বিশ্লেষণ |
| Dow Theory | বাজারের ট্রেন্ড-সংক্রান্ত মৌলিক তত্ত্ব |
| Timeframe | চার্টের সময়মাপ (১ মিনিট, দৈনিক, সাপ্তাহিক...) |
| Line / Bar / Candlestick Chart | লাইন / বার / ক্যান্ডেলস্টিক চার্ট |
| Heikin-Ashi | গড় দিয়ে বানানো মসৃণ ক্যান্ডেল |
| Swing High / Swing Low | ঢেউয়ের চূড়া / খাদ |
| Uptrend / Downtrend / Sideways | ঊর্ধ্বমুখী / নিম্নমুখী / পাশমুখী ধারা |
| Higher High, Higher Low | উঁচু হাই ও উঁচু লো (আপট্রেন্ড) |
| Lower High, Lower Low | নিচু হাই ও নিচু লো (ডাউনট্রেন্ড) |
| Primary / Secondary / Minor Trend | প্রাথমিক / মাধ্যমিক / ক্ষুদ্র ধারা |
| Support / Resistance | দামের মেঝে / ছাদ |
| Role Reversal | ভাঙা ছাদ নতুন মেঝে হওয়া (বা উল্টো) |
| Breakout / Breakdown | ছাদ / মেঝে ভাঙা |
| False Breakout (Fakeout) | ভাঙার ভান করে ফিরে আসা |
| Pullback / Retest | ভাঙার পর ফিরে এসে স্তর পরীক্ষা |
| Trendline / Channel | ধারার রেখা / সমান্তরাল রেখার মাঝের পথ |
| Gap (Breakaway, Runaway, Exhaustion) | দামের ফাঁক (শুরুর, মাঝের, শেষের) |
| Market Breadth, Advance/Decline | বাজারে কতটি শেয়ার বাড়ছে বনাম কমছে |
| Body / Wick (Shadow) | ক্যান্ডেলের মোটা অংশ / সরু রেখা |
| Bullish / Bearish | ঊর্ধ্বমুখী / নিম্নমুখী প্রবণতা |
| Marubozu | সলতেহীন পূর্ণ বডির ক্যান্ডেল |
| Doji (Standard, Long-Legged, Dragonfly, Gravestone) | বডিহীন ক্যান্ডেল ও তার চার রূপ |
| Spinning Top | ছোট বডি ও দুই দিকে সলতেযুক্ত দ্বিধার ক্যান্ডেল |
| Hammer / Hanging Man | নিচে লম্বা সলতের ক্যান্ডেল (ডাউনট্রেন্ডের শেষে / আপট্রেন্ডের শেষে) |
| Inverted Hammer / Shooting Star | ওপরে লম্বা সলতের ক্যান্ডেল (ডাউনট্রেন্ডের শেষে / আপট্রেন্ডের শেষে) |
| Engulfing (Bullish/Bearish) | বড় ক্যান্ডেল ছোটটিকে গিলে ফেলা |
| Piercing Line / Dark Cloud Cover | অর্ধেকের বেশি ফেরত নেওয়া দুই ক্যান্ডেলের রিভার্সাল |
| Harami / Harami Cross | বড় ক্যান্ডেলের ভেতরে ছোট ক্যান্ডেল / ডোজি |
| Tweezer Top / Bottom | সমান হাই / লোর দুই ক্যান্ডেল |
| Morning Star / Evening Star | তিন ক্যান্ডেলের বুলিশ / বেয়ারিশ রিভার্সাল |
| Morning/Evening Doji Star | মাঝে ডোজিযুক্ত স্টার |
| Abandoned Baby | দুই পাশে গ্যাপসহ ডোজি, বিরল রিভার্সাল |
| Three White Soldiers / Three Black Crows | পরপর তিন সবুজ / লাল ক্যান্ডেল |
| Three Inside Up / Down | হারামির নিশ্চিতকরণ |
| Rising / Falling Three Methods | ট্রেন্ড চালিয়ে যাওয়ার পাঁচ ক্যান্ডেল |
| Confirmation | পরের ক্যান্ডেল দিয়ে সংকেত পাকা করা |
| Reversal / Continuation | ধারা উল্টে যাওয়া / চালিয়ে যাওয়া |
| Head & Shoulders (Inverse) | তিন চূড়ার রিভার্সাল (উল্টো রূপ) |
| Neckline | হেড অ্যান্ড শোল্ডার্সের গলার রেখা |
| Double / Triple Top, Bottom | দুই / তিনবার একই স্তরে ধাক্কা খেয়ে ফেরা |
| Rounding Bottom / Top | গোল পেয়ালার মতো ধীর রিভার্সাল |
| Triangle (Ascending, Descending, Symmetrical) | সংকুচিত ওঠানামার ত্রিভুজ |
| Flag / Pennant / Flagpole | খুঁটিসহ পতাকা / ছোট ত্রিভুজ |
| Wedge (Rising / Falling) | কীলক আকৃতির প্যাটার্ন |
| Cup and Handle | পেয়ালা ও হাতলের বুলিশ প্যাটার্ন |
| Rectangle | সমান্তরাল রেঞ্জে আটকে থাকা |
| Price Target | প্যাটার্ন থেকে হিসাব করা সম্ভাব্য লক্ষ্যদাম |
ইন্ডিকেটর ও সংকেতের শব্দ
| টার্ম | অর্থ |
|---|---|
| Indicator | দাম ও ভলিউমের গাণিতিক বিশ্লেষণ-রেখা |
| Lagging / Leading Indicator | পিছিয়ে চলা / আগাম ইঙ্গিত দেওয়া |
| False Signal | ভুল সংকেত |
| SMA / EMA / WMA | সাধারণ / ঘাতীয় / ভারযুক্ত চলমান গড় |
| Golden Cross / Death Cross | ছোট MA বড় MA-কে ওপরে / নিচে কাটা |
| MACD, Signal Line, Histogram | দুই EMA-র পার্থক্য ভিত্তিক গতি-সূচক ও তার উপাদান |
| ADX, +DI, −DI | ট্রেন্ডের শক্তি ও দিক |
| Parabolic SAR | বিন্দুভিত্তিক ট্রেন্ড-ও-স্টপ সূচক |
| Supertrend | ATR-ভিত্তিক ট্রেন্ড রেখা |
| Ichimoku Cloud | জাপানি ট্রেন্ড-মেঘ ব্যবস্থা |
| Momentum | দামের গতি |
| RSI | ০–১০০ স্কেলে গতির সূচক |
| Overbought / Oversold | অতিরিক্ত কেনা / অতিরিক্ত বেচা |
| Divergence (Bullish/Bearish) | দাম ও ইন্ডিকেটরের উল্টো চলা |
| Stochastic (%K, %D) | সাম্প্রতিক পরিসরে ক্লোজের অবস্থান |
| CCI | গড় থেকে দামের সরে যাওয়ার সূচক |
| Williams %R | স্টোকাস্টিকের মতো, ০ থেকে −১০০ স্কেলে |
| ROC | নির্দিষ্ট সময়ে শতাংশ পরিবর্তন |
| Volatility | দামের দোলাচলের মাত্রা |
| Bollinger Bands / Squeeze | গড়ের দুই পাশের ব্যান্ড / সংকোচন |
| Standard Deviation | গড় থেকে ছড়ানোর পরিমাপ |
| ATR | দৈনিক গড় ওঠানামা |
| Keltner Channel | ATR-ভিত্তিক চ্যানেল |
| OBV | ভলিউম জমিয়ে বানানো সূচক |
| VWAP | ভলিউম-ভারযুক্ত গড় দাম |
| MFI | ভলিউমসহ RSI |
| Accumulation / Distribution | বড়দের জমানো / ছাড়া |
| Fibonacci Retracement | ৩৮.২%, ৫০%, ৬১.৮% ইত্যাদি সম্ভাব্য ফেরার স্তর |
| Pivot Points | আগের দিনের হিসাবে সাপোর্ট-রেজিস্ট্যান্স |
| Elliott Wave / Gann | ঢেউ ও কোণভিত্তিক উন্নত তত্ত্ব |
| Confluence | একাধিক সংকেতের একই জায়গায় মিল |
| Multi-Timeframe Analysis | বড় ও ছোট টাইমফ্রেম মিলিয়ে বিশ্লেষণ |
| Entry / Exit / Target | প্রবেশ / প্রস্থান / লক্ষ্যদাম |
| Long / Short | দাম বাড়ার বাজি / কমার বাজি |
| Profit Booking | লাভে বেচে লাভ তুলে নেওয়া |
| Trailing Stop / Break-even Stop | স্টপ-লস ধাপে ধাপে ওপরে তোলা / কেনা দামে আনা |
| Bull Trap / Bear Trap | ভুয়া ব্রেকআউট / ব্রেকডাউনের ফাঁদ |
| Backtesting | অতীতের চার্টে নিয়ম যাচাই |
ঝুঁকি ও মনস্তত্ত্বের শব্দ
| টার্ম | অর্থ |
|---|---|
| Stop Loss | আগে থেকে ঠিক করা সর্বোচ্চ লোকসানের দাম |
| Risk-Reward Ratio | ঝুঁকি বনাম সম্ভাব্য লাভের অনুপাত |
| Expectancy | বহু ট্রেডে গড়ে লাভ হবে কি না তার হিসাব |
| Position Sizing | কত শেয়ারে ঢুকব তার হিসাব |
| Diversification | টাকা ছড়িয়ে রাখা |
| Correlation | দুই শেয়ারের একসঙ্গে ওঠানামার সম্পর্ক |
| Drawdown | সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে পতন |
| Leverage / Margin Loan | ধার করা টাকায় বিনিয়োগ |
| Liquidity Risk | বেচতে চাইলে ক্রেতা না পাওয়ার ঝুঁকি |
| Trading / Investing / Swing Trading | স্বল্পমেয়াদি / দীর্ঘমেয়াদি / মাঝামাঝি মেয়াদি লেনদেন |
| Buy and Hold | কিনে দীর্ঘদিন ধরে রাখা |
| DCA / SIP | নিয়মিত নির্দিষ্ট অঙ্কে বিনিয়োগ |
| Paper Trading | কাল্পনিক টাকায় অনুশীলন |
| Trading Journal | প্রতিটি ট্রেডের লিখিত খতিয়ান |
| FOMO | হাতছাড়া হওয়ার ভয় |
| Greed / Fear | লোভ / ভয় |
| Herd Mentality | ভিড়ের পেছনে চলা |
| Loss Aversion | লোকসান মেনে নিতে না পারা |
| Confirmation Bias | নিজের মতের পক্ষের তথ্যই খোঁজা |
| Anchoring | নিজের কেনা দামে আটকে থাকা |
| Overconfidence | অতি-আত্মবিশ্বাস |
| Averaging Down | হারা শেয়ার আরও কিনে গড় দাম কমানো |
| Revenge Trading | রাগের মাথায় ক্ষতি ফেরত পেতে ট্রেড করা |
| Sunk Cost Fallacy | আগে ঢালা টাকার মায়ায় খারাপ অবস্থানে থাকা |
| Rumor / Tips | গুজব / গোপন পরামর্শ |
| Pump and Dump | দাম চড়িয়ে বেচে বেরিয়ে যাওয়ার কারসাজি |
শেষ কথা
মিজান চাচার বাসা থেকে বেরোনোর সময় তানভীর বলল, "চাচা, আজ আমি আমার প্রথম আসল বিনিয়োগটা করছি না। আমি আরও দুই মাস কাল্পনিক টাকায় চর্চা করব।"
চাচা হেসে বললেন, "এই একটি সিদ্ধান্তই তোমাকে অনেক নতুনের চেয়ে এগিয়ে রাখল।"
এই লেখা পড়ে আপনি শেয়ারবাজারের সব শিখে ফেলবেন না, সেটা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তবে এখন আপনার কাছে একটা মানচিত্র আছে। ফান্ডামেন্টাল বলে কী কিনবেন, টেকনিক্যাল বলে কখন, আর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বলে কতটা আর কখন বেরোবেন। এই তিনটি একসঙ্গে চললেই শেয়ারবাজার জুয়া থাকে না, হয়ে ওঠে পরিকল্পিত বিনিয়োগ।
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একটি বিও অ্যাকাউন্ট খুলে ছোট অঙ্কে শুরু করুন, কিংবা ডিএসইর চার্ট খুলে এই লেখার প্যাটার্নগুলো নিজের চোখে খুঁজে দেখুন। দেখবেন, আগে যেটাকে দুর্বোধ্য রেখা মনে হতো, এখন সেটা একটা গল্প বলছে।
আবারও মনে করিয়ে দিই: এই লেখা শুধু শিক্ষামূলক। এখানে উল্লিখিত কোম্পানি, সংখ্যা ও পরিস্থিতি কাল্পনিক। ক্যাটাগরি, সার্কিট ব্রেকার, সেটেলমেন্ট ও কর-সংক্রান্ত নিয়ম সময়ে সময়ে বদলায়, তাই বিনিয়োগের আগে ডিএসই, বিএসইসি ও আপনার ব্রোকারের হালনাগাদ নিয়ম দেখে নিন। কোনো বিনিয়োগের ফলাফল নিশ্চিত নয়।